বই বাড়ি
সালমান হাসান রাজিব
বাড়িভর্তি বিস্ময়-জাগানিয়া বই-সংগ্রহ,
আর সেখানে রাজত্ব যেন এসব গ্রন্থরাজির। অবাক প্রতিটি বইবাড়িই গ্রন্থভাণ্ডারে সমৃদ্ধ। বুকশেলফে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব, সাহিত্যপত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিনসহ বিশ্বসাহিত্যের রকমারি বইয়ের ঠাসবুনোট। আছে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের সময়কার দৈনিক পত্রিকাও। বাড়িভর্তি বিচিত্র রকমের বই গ্রন্থকীটদের যে মুগ্ধ করবেই, তাতে বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই।
দিনযাপনের সঙ্গে পঠনপাঠন, বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা ও সক্রিয়তাকে যুক্ত করতে চান তাঁদের কেউ কেউ । উদ্দেশ্য , জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে মতাদর্শ গঠনের মাধ্যমে দেশ, সমাজ, রাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া । আর সেই লক্ষ্যে এ কাজে অন্যদেরও যুক্ত করতে নানাভাবে তৎপর সমাজে '“বিদগ্ধজন' বলে পরিচিত এসব ব্যক্তিরা। জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে পরিগঠিত হতে নিবিড়ভাবে, নিরন্তর নিজেরা যেমন- বইচর্চা ও পঠনপাঠন করেন, তেমনি অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করেন।
দীর্ঘদিনের শ্রম ও ব্রতনিষ্ঠায় তারা রপ্ত করেছেন সেই শিল্প; ইংরেজিতে যেটিকে বলে ‘Art of Reading’ অর্থাৎ পঠনচর্চা কিংবা পঠনবিদ্যা। আর সেই বিদ্যা বা শিল্পটিকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার মানসে গড়ে তুলেছেন বহুসংখ্যক স্টাডি সার্কেল, পাঠচক্রসহ বুদ্ধিবৃত্তির নানা পাটাতন।
মলাটবদ্ধ গ্রন্থের পাতায় পাতায় মুদ্রিত, শব্দে-বর্ণে ভাষিত নানা মত, চিন্তা, দার্শনিক ভাবনা ও পর্যালোচনাকে সজীব চিন্তায় রূপান্তরের মানসেই তাদের এমনসব তৎপরতা ও
অনেকে । নিজের ছাড়াও অন্যদের জন্যও পকেটের টাকা খরচ করে অকাতরে বই কিনে বিলিয়ে থাকেন।
বাড়িভর্তি বিস্ময়-জাগানিয়া বই-সংগ্রহ, আর সেখানে রাজত্ব যেন এসব গন্থরাজির ৷ অবাক প্রতিটি বইবাড়িই গ্রন্থভাণ্ডারে সমৃদ্ধ । বুকশেলফে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব, সাহিত্যপত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিনসহ বিশ্বসাহিত্যের রকমারি বইয়ের ঠাসবুনোট ৷ আছে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের সময়কার দৈনিক পত্রিকাও। বাড়িভর্তি বিচিত্র রকমের বই গ্রন্থীটদের যে মুগ্ধ করবেই , তাতে বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই৷ ফেসবুক, ইউটিউবের দোর্দপ প্রতাপের যুগেও বইয়ের গুরুত্ব যে একটুকুও কমেনি, বইবাড়ির ব্যক্তিগত এসব পাঠাগার যেন তার অনন্য দৃষ্টান্ত।
বিশালায়তনের এই বইয়ের অধিকারীরা অনেক বেশি মাত্রায় বই সংগ্রহ করেন । তাদের কেউ কেউ একদিনে ২০-২৫টিও বই , পত্রিকা বা রচনাবলী কিনে বসেন। অনলাইনেও বইয়ের অর্ডার করেন হরহামেশাই ।
বইয়ের দোকানে বিশেষ কোনো বই দেখলেন, কিন্তু নিজের সংগ্রহে নেই-চটপট সেটি
প্রয়াস । জ্ঞানী ও আলোকিত মানুষ বলে পরিচিত এসব ব্যক্তির সত্গে বইবাড়ি, বইপাঠ, বইচর্চা কিংবা পঠনবিদ্যা নিয়ে একাধিক আলাপচারিতায় সেটিই প্রতিভাত হয়েছে।
আর জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতায় সক্রিয় এসব ব্যক্তির 'সংগ্রহে' রয়েছে সুপ্রচুর বই। হাজার হাজার বইয়ের এসব সংগ্রাহক সমঝদার, উঁচু মাপের ও সিরিয়াস পাঠক বলে পরিচিত। বইচর্চা তাদের শখ, সৌখিনতা ও নেশাও। পঠনবিদ্যাতেও তাদের জুড়ি মেলা ভার। তবে পঠনপ্রিয় এসব মানুষ গোগপ্রাসে বই পড়ে শুধু নিজেরাই জ্ঞানার্জন করে থেমে নেই। একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক নিষ্ঠা ও সততার [ সঙ্গে নির্মোহভাবে, নির্ভূতে |. পঠনচর্চা ছড়িয়ে দিতে কাজ করছেন। নিজ নিজ পথ ও পদ্ধতিতে এই কাজ করছেন তাদের একেকজন । তাদের কেউবা ব্যক্তিগত লাইব্রেরির পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন গণপাঠাগার। বই কীভাবে, কোন কায়দায় বা তরিকায় পড়তে হয়, তার কলাকৌশল সম্পর্কেও [6 পাঠদান করেন কেউ কেউ ৷ | দরকারি কাজে বই ধার ৮. দিয়েও সহায়তা করেন ৮
কিনে ফেললেন। ফেসবুকে একটু টু মারতে আসলেন, তখন চোখে পড়ল দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য কোনো বই সঙ্গে সঙ্গে অর্ডার করে ফেললেন। এ ছাড়া পত্রিকা বিক্রেতা বা এজেন্টের দোকানে যেসব মাসিক, ত্রৈমাসিক, যান্মাসিক , ঈদ-পূজা সংখ্যা আসে, তারা
ক্রেতা।
সমঝদার ও সিরিয়াস পাঠক গাজী ফরিদ আহমেদের সংগ্রহে হাজার হাজার বই
বইয়ের জুপে ঢাকা টেবিল । বুকশেলফের জায়গা ফুরিয়ে বই উঠে এসেছে
খাটে, মেঝেতে, জানালার ধারে।
« ॥| গাজী ফরিদের ঘরে ঢুকতেই প্রথমে চোখ পড়ল খাটের ওপরটায় । দেখলাম, বিছানার অর্ধেকটা বইয়ের দখলে। হাতখানেক উঁচু পর্যন্ত বইয়ের ওপর বই। মাথার কাছেও অনেক বই । খাটের পাশের দেয়ালজোড়া | বিশাল একটি বুকশেলফ। -। সেটিতেও বই আর বই। ৷ খাটের পেছন দিকটায় বইয়ের আরও সাত-আটটি শেলফ। একটি র্যাক ও
টেবিলের ওপরও বইয়ের উঁচু ঢিবি ।
চা-নাশতার পর ফরিদ আহমেদ বললেন, 'আমার বইপত্র দেখ; হয়তো ভালো লাগবে ।” দেখলাম, বিচিত্র ও বহুমাত্রিক বইয়ের সমাহারে ভরপুর সংগ্রহ তার । একটি শেলফে মার্কসের পুঁজি গ্রন্থের ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদের একাধিক সংস্করণ ।
ওই শেলফটির সব বই-ই রাজনৈতিক সাহিত্যের । মার্কস ছাড়াও ফ্রিডরিখ আ্যাংগলস, লেনিন, স্টালিন, মাও সেতুং, রুশো, গ্রামসি, মিশেল ফুকো , দেরিদা, লুকাচসহ আরও অনেক দার্শনিকের শত শত বই । এ ছাড়া ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস, গণিত ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ওপর শত শত বইপুন্তকে ঠাসা ঘরের শেলফগুলো ৷ একটি বুকশেলফের তাকে চোখে পড়ল- ইবনে খালদুনের আল-মুকাদ্দিমাসহ ইমাম গাজালি, আল-বিরুনির মতো আরও অনেক মুসলিম স্কলারের বই। এ ছাড়াও দেখা গেল, বন্কিম ও নজরুলসহ বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য লেখকদের অধিকাংশ রচনাবলীই তার কাছে আছে।
শেলফগুলোর বিভিন্ন তাকে রকমারি সব বইয়ের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য সব লেখকের বই রয়েছে। তিন বন্দ্যোপাধ্যায়-তারাশঙ্কর, মানিক ও বিভূতিভূষণ; অন্যদিকে শরৎচন্দ্র, বনফুল, জগদীশ গুপ্ত, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসসহ বাংলা ভাষা-সাহিত্যের কোনো লেখকেরই বই যেন বাদ পড়েনি।
বই ছাড়াও বিপুল সংখ্যক ঈদসংখ্যা , সাহিত্যপত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিন আছে তার গ্রন্থশালায়। দেশ, সানন্দা, অনিক, সাম্প্রতিক দেশকাল, সর্বজনকথাসহ বহু রকমের ম্যাগাজিন ও পত্রিকার স্তুপ রয়েছে । যার সংখ্যা কয়েক হাজার ৷ সত্তর ও আশির দশকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনও রয়েছে তার সংগ্রহে। একসময়কার সেরা লিটল ম্যাগ বক্তব্য ও গণসাহিত্য-এর বেশ কয়েকটি সংখ্যা তার কাছে আছে।
বিশ্বসাহিত্যের বিশাল এক সংগ্রহ গড়েছেন তিনি । দেখলাম, রুশ সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য লেখকদের বই তিনি সংগ্রহ করেছেন। লিও তলঙ্তয় , দম্তয়েভস্কি, আলেকজান্দ্র দুমা, আন্তন চেখভ, ইভান তুর্গেনেভ ছাড়াও অন্য প্রায় সবার বই-ই আছে। এ ছাড়াও আলবেয়ার কামু, ফ্রানৎস কাফকা , হারমান হেসে, হোর্হে লুইস বোর্হেস , গুন্টার গ্রাসসহ বিশ্বখ্যাত সব লেখকের গল্প ও উপন্যাসের ঠাসবুনানি তার বুকশেলফজোড়া । যশোর-খুলনার ইতিহাস বইয়ের একটি পাতা ফটোকপি করতে খুলনায় যাওয়া
শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান কেবল আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। তাকেও প্রচুর পড়াশোনা করতে দেখতাম । একবার তার রেফারেঙ্গে যশোর পাবলিক লাইবেরি থেকে সতীশচন্দ্র মিত্রের লেখা যশোর-খুলনার ইতিহাস বইটি ফটোকপি করে নিই । কিন্তু পড়তে পড়তে দেখলাম, বইটির প্রথম খণ্ডের কয়েকটি পাতা নেই। ধারণা করলাম, কোনো পাঠক হয়তো সেগুলো রেড দিয়ে কেটে নিয়ে গেছে- গাজী ফরিদ বলেন। এরপর শামসুর রহমান কেবল খুলনায় কর্মরত দৈনিক বাংলার এক সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। তাঁর মাধ্যমে খুলনার উমেশচন্দ্র লাইব্রেরি থেকে আমি ও লেখক-গবেষক বেনজিন খান বইটির সেই পৃষ্ঠাগুলো ফটোকপি করে আনি ।
পাঠক হয়ে ওঠার গল্প
১৯৭৪ সাল । নভেম্বর মাস । প্রচণ্ড শীতকাল । পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসে গাজী ফরিদ আহমেদের পরিবার । এসে উপশহরের ই-রকে বসতি গড়েন । এর আগে এক বছর তারা ছিলেন পাকিস্তানের একটি মিলিটারি ক্যাম্পে । সেদেশে তার বাবা আর্মিতে চাকরি করতেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার বাবা বাংলাদেশে চলে আসার অপশন গ্রহণ করেন। সপরিবারে দেশে ফিরে আসেন । এক বছর ক্যাম্পে থাকার কারণে স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাননি । বাড়িতে বসে সেই অখণ্ড অবসরে বেহেশতি জেওর ও মকসুদুল মোমিন পড়তেন। তখনকার প্রায় প্রত্যেক মধ্যবিত্ত মুসলমান বাড়িতে ওই বই দুটি থাকত। এক রেডিও আর ওই বই দুটি ছাড়া সময় কাটানো ও বিনোদনের কোনো মাধ্যম ছিল না- জানান গাজী ফরিদ আহমেদ ।
ওই বই পড়তে পড়তে মানুষের নানা প্রবৃত্তি, আবেগসহ মানবীয় নানা দিক সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয় তার। এমনকি গড়ে ওঠে পাঠাভ্যাসও । ভেতরে ভেতরে অনেক ধার্মিকও হয়ে ওঠেন বলে তিনি জানান।
দেশে ফিরে এসে অরাজকতার এক বাতাবরণের ভেতর বেড়ে ওঠার এক পর্যায়ে কিছু দুর্বৃত্ত ধরনের ছেলেদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে ৷ সে সময় উপশহরের পরিবেশটাই ছিল অত্যন্ত খারাপ ৷ নানান সামাজিক বিশৃঙ্খলায় ভরা । পরবর্তীতে আর্মি ও এয়ারফোর্সের কর্মকর্তারা সেখানে এসে বসবাস করতে লাগলে বদলাতে থাকে পরিবেশ ।
উপশহরে নতুন আসা ওইসব পরিবারের ছেলেদের সঙ্গে মিশতে ভালো লাগতে শুরু করে গাজী ফরিদের ৷ তাঁদের আচার-আচরণ আকৃষ্ট করে তাকে । কিন্তু তাদের সঙ্গে 'আ্যাডজাস্ট' করে উঠতে না পেরে মনের ভেতর একধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি হয় । আর এই হীনম্মন্যতাই তাকে মনে করিয়ে দেয়, প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া থেকে তিনি ছিটকে
চন এ
জ্ঞানচর্চার বিস্তারে এ পর্যন্ত বারোটি পাঠচক্রু পরিচালনা করেছেন গাজী ফরিদ আহমেদ । গত ১২ বছর ধরে এমনটি করে আসছেন। সেইসব পাঠচক্রের সদস্যদের অনেকেই এখন নিয়মিত বই কেনেন ও পড়েন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনা করে যতটুকু জ্ঞান আহরণ করতে পেরেছেন, তা তরুণদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই উচিত
পড়েছেন। তখনই বোধোদয় হয় শিক্ষিত হয়ে উঠতে হবে তাকে ।
এর পরপরই ফকির শওকতের (বর্তমানে সাংবাদিক) সঙ্গে পরিচয় হয়। 'উপশহরে ওরা নতুন আসল তখন । পরিচয়ের পর ফকির শওকত আমাকে বেশ কিছু বই পড়তে দিল। ওর বাড়িতে সে সময় বেশ কিছু বইপত্র ছিল।
তিনি বলেন, “ও আমাকে মানচিত্র নামে শংকরের একটি গল্পসংকলন পড়তে দেয়। সংকলনটিতে একটি গল্পের নাম ছিল অশ্রমামা ৷ ওই গল্পটি পড়ে আমি খুব কেঁদেছিলাম। তারপর থেকেই গল্পের প্রতি আলাদা একটা আকর্ষণ জন্মায় । শুরু হয় গল্পের বই কেনা । বিশেষ করে বিদেশি গল্পের বাংলা অনুবাদ বইগুলো কিনতাম। মনে করতাম, অনুবাদ বই-ই সবচেয়ে ভালো হয়।
তো, একদিন দড়াটানার বাবুল লাইব্রেরি থেকে ভিক্টর হুগোর লা মিজারেবল বইটির বাংলা অনুবাদ কিনলাম। বইটি মুক্তধারা প্রকাশনী থেকে বের হয়েছিল । বইটি ছিল কিশোর সংস্করণ । ওই বইটি আমার আবেগে খুব নাড়া দিল। এরপর থেকে আমি নিয়মিত বই পড়া শুরু করলাম”- বলেন গাজী ফরিদ আহমেদ ।
এরপর সাদাত হাসান মান্টো, খাজা আহমেদ আব্বাস, ইসমত চুগতাই , কৃষণ চন্দর, মুঙ্গি প্রেমটাদ এঁদের গল্পসংকলন কিনে পড়া শুরু করি। সেটা ছিল সত্তরের দশক । সে সময় মুক্তধারা থেকে অনেক ভালো অনুবাদ বের হতো ৷ সত্যেন সেনের অভিশপ্ত নগরী পড়ে আরও মুগ্ধ হলাম । আগ্রহ আরও বেড়ে গেল- বলেন তিনি ।
জ্ঞানের রাজ্যে ঠেলে দিলেন ডা. মাসুদুর রহমান
আলাপচারিতায় বইয়ের জগতে প্রবেশের ব্যাপারে ডা. মাসুদুর রহমানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করলেন গাজী ফরিদ । বললেন, 'আমার দাদি ছিলেন খুবই বয়স্ক একজন মানুষ। প্রায়ই তিনি অসুস্থ থাকতেন । আর তার চিকিৎসার জন্য শহরের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোডে ডা. মাসুদের চেম্বারে ঘন ঘন যাতায়াত করতাম । তাঁকে সেখান থেকে বাড়িতে নিয়ে আসতাম।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তিনি যখন ফ্রি হতেন, রিকশায় করে বাড়িতে নিয়ে যেতাম। অপেক্ষার ফাকে তার চেম্বারে রাখা সংবাদপত্র পড়তাম। চেম্বারে তিনি আজাদ, ইত্তেফাকসহ তিন-চারটি খবরের কাগজ রাখতেন।
অনেক পড়ুয়া একজন মানুষ ছিলেন ডাক্তার। তার চেম্বারে গেলে আমি শুধু খবরের কাগজ টানাটানি করতাম। হঠাৎ একদিন বিরক্তিভরেই তিনি বললেন, “এত খবরের কাগজ পড় কেন? কী পাও, কী বোঝ সংবাদপত্র পড়ে?”
তার কথা শুনে আমি একটু অবাক হলাম। ভেতরে ভেতরে ক্ষোভও হলো, রেগেও গেলাম । তখন আমি বললাম, “তো কী পড়ব?”
তিনি তখন বললেন, “বই পড়বা ৷ খবরের কাগজে তো চলতি ঘটনা থাকে৷ তা থেকে তুমি কী পাবে!”
প্রত্যুত্তরে প্রশ্ন ছুড়লাম, “কী বই পড়ব?”
তিনি বললেন, “তুমি তো রাজনীতির খবর বেশি পড় । বাজারে একটা বই পাওয়া যায় আবুল মনসুর আহমেদের আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর । ওই বইটা পড় ৷ ওটা তোমার জন্য ভালো হবে ।”
তখনই বইটি কেনার জন্য বের হয়ে গেলাম এবং লাইব্রেরি থেকে বইটি কিনেও ফেললাম । অনেক দ্রুতই পড়েও শেষ করলাম। এখন মনে হয়, ওনার সেই বকুনিটা আমার অনেক কাজে লেগেছে। সেদিন তিনি না বকলে বইপাঠের ব্যাপারে এতটা সিরিয়াস হতাম না।
ফরিদ আহমেদ বলেন, “আগে বইয়ের রেজিস্টার মেইনটেইন করতাম। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর বইটা আমার বইয়ের রেজিস্টারের সূচিতে একদম এক নম্বরে রেখেছি। কারণ, ডা. মাসুদের জন্যই গড়ে উঠেছে বইপাঠ ও বইচর্চার এই অভ্যাস। যার কারণে তাকে আমি আমার গুরুও মনে করি। আমার বাবার পরেই তাঁকে স্থান দিই ।”
বারোটি পাঠচক্র
জ্ঞানচর্চার বিস্তারে এ পর্যন্ত বারোটি পাঠচক্রু পরিচালনা করেছেন গাজী ফরিদ আহমেদ । গত ১২ বছর ধরে এমনটি করে আসছেন । সেইসব পাঠচক্রের সদস্যদের অনেকেই এখন নিয়মিত বই কেনেন ও পড়েন।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনা করে যতটুকু জ্ঞান আহরণ করতে পেরেছেন, তা তরুণদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই উচিত । এ ছাড়া সমাজ থেকে জীবনে অনেক কিছু শিখেছেন এবং পেয়েছেনও অনেক আর সেই বিরাট প্রাপ্তির যে খণ, তার যে দায় সেসবের কিছুটা শোধ করাটাও তার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে বলে তিনি মনে করেন। সেই মানসিকতা থেকেই একের পর এক পাঠচক্রু গড়ে তুলেছেন । অর্জিত জ্ঞানের এই ভাগাভাগি করে নেওয়াকে তিনি ধর্মীয় দায়িত্বের মতোই মনে করেন।
'সপ্তাহে একটি বই পড়ি'র প্রতিষ্ঠাতা শাহ্জাহান কবীরের বই সংগ্রহ
বইয়ের সঙ্গে শাহ্জাহান কবীরের নিবিড় মিতালি গড়ে ওঠে একদম ছেলেবেলায় । তাদের বাড়িতে ভালো মানের একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার ছিল সে সময়। তার দুই চাচা তখন স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ওই দুই চাচা মিলে বাড়িতে লাইব্রেরিটি গড়ে তুলেছিলেন । বাড়ির সেই গ্রন্থশালায় বসে বই পড়তে পড়তে কিশোর শাহ্জাহান কবীর জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণ করতে শেখেন। ঠিক তখন থেকেই বই পড়ায় আগ্রহী হন ও পাঠাভ্যাস তৈরি হয় তার ।
সে সময় তিনি রুশ কথাসাহিত্যিক ইভান তুর্গেনেভ ও ম্যাক্সিম গোর্কির লেখার সঙ্গে পরিচিত হন। তাদের বাড়ির পাঠাগারটিতে বিশ্বসাহিত্যের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যেরও বই ছিল সুপ্রচুর। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিম ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা গল্প ও উপন্যাসের অনেকগুলো বাড়ির বই-সংগ্রহ থেকে তিনি পড়ে ফেলেন তখন ।
শাহ্জাহান কবীর জানান, তার দুই শিক্ষক চাচার মধ্যে একজন নাটক লিখতেন ও নাটকে অভিনয় করতেন। চাচাদের দু'জনেই ছিলেন সংস্কৃতিমনা। তাদের কাছ থেকে ভালো গুণের অনেক কিছু রপ্ত করেছেন।
টযাাতাা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বন্ধুরা মিলে একবার বলাকা সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে বেরিয়েছিলেন। সেদিন হঠাৎ তার মনে হয়েছিল, সিনেমা না দেখে একটা করে বই কিনে ফিরে গেলে ভালো হয়। বন্ধুরাও তাতে সম্মতি দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে সবাই রাহুল সাংকৃত্যায়নের লেখা 'ভোলগা থেকে গংগা' বইটি কিনে হলে ফেরেন
শাহ্জাহান কবীর বর্তমানে যশোর শহরের খড়কি এলাকায় বসবাস করেন। সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তিনি । বই কেনা ও পড়াটা তার একরকম নেশা ।
শুধু তাই নয়, অন্যদের বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে তার উদ্যমেরও জুড়ি নেই! বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গঠনে যশোরের শিক্ষকদের মধ্যে তিনিই অগ্রগণ্য
কলেজের নিজ বিভাগে 'ক্লাসরুম' লাইবেরি গড়ে তুলেছেন।
এ ছাড়া তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ “সপ্তাহে একটি বই পড়ি' নামে একটি সংগঠনের সৃষ্টি ৷
বছরের ৫০ থেকে ৫২টি অধ্যয়নচক্রের আয়োজন করে সংগঠনটি ।
সেখানে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন বই যেমন পড়া হয়, তেমনি আলোচনা হয় পঠিত বইয়ের ওপর ৷ এ ছাড়া সংগঠনটি বছরে বেশ কয়েকটি প্রতিবেশ-অধ্যয়নের আয়োজন করে।
শাহ্জাহান কবীরের বাড়িটি যেন বইয়ের একটি ভাণ্ডার । চারটি শেলফভর্তি রকমারি সব বই । এ ছাড়াও টি-টেবিল , রিডিং টেবিল ও মেঝেজুড়েও বই আর বই ৷ খাটের মাথার কাছেও বই রাখা । সুউচ্চ বইয়ের শেলফে জ্ঞানরাজ্য হাতছানি দেয় বইপ্রিয়দের ৷
তার সংগ্রহে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিভূতিভূষণ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ভার্জিলের রচনাবলীর সবকটি খণ্ড রয়েছে। এ ছাড়াও তারাশঙ্কর, মানিক, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ , বুদ্ধদেব বসু, হাসান আজিজুল হক, খুশবন্ত সিং ও হুমায়ূন আহমেদসহ আরও অন্যান্য কথাসাহিত্যিকদের বই রয়েছে। সংগ্রহে রয়েছে শেক্সপিয়ার, বাষ্্রান্ড রাসেল, আইজ্যাক আসিমভ , জর্জ সার্টন ও স্টিফেন হকিংস সহ আরও অনেকের বইপত্র ।
কবিতা পড়তে ভালোবাসেন শাহ্জাহান কবীর ।
তার কাছে জীবনানন্দ, হেলাল হাফিজ, আল মাহমুদ, আহমদ রফিক , রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, বিষ্ণু দে-সহ অন্যান্য কবিদের কবিতার বই রয়েছে।
দর্শন তার প্রিয় পাঠ্য । চার্বাক ও ভারতীয় অন্যান্য দর্শনের অনেক বই দেখা গেল তার শেলফজুড়ে ৷ ইতিহাসের শিক্ষক তিনি । সংগতই এই বিষয়টির ওপরও তার প্রচুর বই। রোমিলা থাপার, নিহাররঞ্জন, ইরফান হাবিব, মুনতাসীর মামুনসহ আরও অনেকের লেখা বিপুল সংখ্যক ইতিহাসের বই রয়েছে তার ।
গ্রিক সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে সোফোর্লেস ও ইউরিপিদিসের রচনা । এ ছাড়াও সিগমুন্ড ফ্রয়েড, জাঁ-পল সার্্র, এডওয়ার্ড সাঈদসহ আরও অনেকের বিপুল সংখ্যক বই তিনি সংগ্রহ করেছেন।
শাহ্জাহান কবীর জানান, বিভিন্ন সময়ে নীলক্ষেত, নিউমার্কেট , আজিজ সুপার মার্কেট , একুশের বইমেলা ও ফুটপাত থেকেও বই কিনেছেন । ক্লাস সেভেন থেকে নিয়মিত বই কেনেন।
সিনেমা না দেখে বই কিনে হলে ফেরেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বন্ধুরা মিলে একবার বলাকা সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে বেরিয়েছিলেন।
সেদিন হঠাৎ তার মনে হয়েছিল, সিনেমা না দেখে একটা করে বই কিনে ফিরে গেলে ভালো হয়। বন্ধুরাও তাতে সম্মতি দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে সবাই রাহুল সাংকৃত্যায়নের লেখা 'ভোলগা থেকে গংগা' বইটি কিনে হলে ফেরেন ।
শাহ্জাহান কবীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একবার দুপুরে খাওয়ার টাকা খরচ করে বই কিনে ফেলি । সেদিন দুপুরটা না খেয়ে ছিলাম ।
তিনি আরও বলেন, এখনো নিয়মিত বই কিনি। অনলাইনে বইয়ের অর্ডার দিই । যশোর স্টেডিয়াম গ্যালারি মার্কেটের “নির্বাচিত' থেকে প্রায়শই বই কেনা হয়। বই পড়ার মতো নতুন নতুন বই কেনাটাও অভ্যাস হয়ে দাড়িয়েছে ৷
চন এ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বন্ধুরা মিলে একবার বলাকা সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে বেরিয়েছিলেন।
সেদিন হঠাৎ তার মনে হয়েছিল, সিনেমা
না দেখে একটা করে বই কিনে ফিরে গেলে ভালো হয়। বন্ধুরাও তাতে সম্মতি দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে সবাই রাহুল সাংকৃত্যায়নের লেখা 'ভোলগা থেকে গংগা' বইটি কিনে হলে ফেরেন।
মন্তব্য করুন
মন্তব্যটি পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হবে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি
এখনও কোনো প্রকাশিত মন্তব্য নেই।