সাহিত্য ও সংস্কৃতি
প্রবন্ধ · Site Administrator · 2026-10-19

বড় অংশ মনে করেন বৃটিশ না এলে আমরা আলোকিত হতাম না

মামুন আজাদ

ফয়েজ আলম “এই' ন্যারেটিভ ভেঙ্গেছেন এবং উপমহাদেশের বিস্মৃত ইতিহাস টেনে বের করেছেন বৈজ্ঞানিক উপায়ে যা উপেক্ষা করা যায় না।

“জ্যাক দেরিদা প্রসঙ্গে : ভাবমূর্তি ও পাঠ' এই প্রবন্ধে ফয়েজ আলম জ্যাক দেরিদার ভাবমূর্তি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন যে, “তিনি(দেরিদা) পশ্চিমের জ্ঞানভাষ্যের গ্রন্থি খুলে সেগুলোর অন্ত:সারশুন্যতা প্রমাণ করে ছেড়েছেন, পশ্চিমের দার্শনিক এঁতিহ্যের মাতব্বরি লাটে তুলেছেন ।”

“বুদ্ধিজীবী তার দায় ও বাঙালীর বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ত্ব ' গ্রন্থে ফয়েজ আলম ভূমিকায় বলেন, “ প্রায় দুইশ বছরের উপনিবেশী শাসন ও শোষণ বাঙালির জাতিগত সত্তায় এমন কিছু ক্ষত তৈরি করে রেখে গেছে যার পরিণাম আমরা এখনো ভোগ করছি । এর প্রভাব পড়েছে আমাদের সমাজ, রাজনীতি , সংস্কৃতিসহ সব জায়গাতেই ।

কেবল বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা দেখছি যে-সব দেশ উপনিবেশী শাসন-শোষণে নির্যাতিত হয়েছে এখন সেগুলোতেই চলছে গনতন্ত্রের নামে রাজনৈতিক নৈরাজ্য , আর্থ-সামাজিক শোষণ-নির্যাতন-বিশৃঙখলা , নয়া উপনিবেশী আগ্রাসন । আমার লেখালেখির মধ্যে দিয়ে এই পরিস্থিতির গোড়াটা আমি চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি উপনিবেশী শাসনের পরিপ্রেক্ষিত থেকে ।”

১. ভাষা আর সংস্কৃতির ক্ষমতা : ক্ষুদ্র জাতিগুলোর অবস্থান

২. ইতিহাসের দর্শন, উপনিবেশের বাসনা

৩. বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব

৪. বাংলা ভাষা বিষয়ে

৫. উত্তর-উপনিবেশী কবিতা : একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকা

৬. আন্তোনিও গ্রামসি : সিভিল সোসাইটি প্রসঙ্গে

এই ছয়টি প্রবন্ধ বিশ্লেষণে প্রথমে 'ভাষা আর সংস্কৃতির ক্ষমতা : ক্ষুদ্র জাতিগুলোর অবস্থান" প্রবন্ধে দেখতে পাই ফয়েজ আলম ভাষাতাত্ত্বিক 'সোস্যুর'এর বিশ্লেষণ করেন এবং দেখান যে, 'ভাষার ব্যবহার বিচিত্র ৷ প্রবাদ, রূপক, অলংকার ইত্যাদি রূপে ভাষার মধ্যে জমা হয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট জাতির অহমিকার প্রসংগ, এমনকি মিথ্যা অহমিকার কথ 1ও থাকতে পারে। তেমনি থাকতে পারে অন্য জাতির প্রতি ঘৃণার প্রকাশও ৷ যেমন আর্য ভাষাগুলোয় এই প্রবনতা অনেক বেশি । বাংলায় “ঘাড়মোটা' কথাটার অর্থ যুক্তিহীন একগুঁয়ে । এটি আর্যভাষা ব্যবহারকারী মানুষদের (সাধারণভাবে যাদেরকে আর্য বলা হয় তাদের) সৃষ্ট কথা, বাংলায় চালু হয়ে গেছে। এদেশের আদিবাসিন্দা অর্থাৎ ভেডিডড বা আদি-অস্ট্রেলীয়দের ঘাড় মোটা ও খাটো । দখলদার আর্যরা এখানে ঢুকতে গিয়ে স্থানীয় মানুষদের প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়েছিল নিশ্চয়ই । সেজন্যই স্থানীয়দেরকে হেয় করার জন্য ঘাড়মোটা কথাটা চালু করে থাকবে। এখন যে কোনো বাঙালিই হয়তো কথাটা ব্যবহার করেন নিজের অজান্তেই । এমনকি যার শরীরে ভেডিডড প্রভাবের আধিক্যের কারণে ঘাড়টা খানিকটা মোটা আর খাটো রয়ে গেছে তিনিও কথাটা উচ্চারণ করবেন। এভাবে ভাষার গুপ্ত আগ্রাসনের কারণে তিনি নিজেই নিজেকে নিয়ে মস্করা করে বসবেন, নিজের বিরুদ্ধে দীড়াবেন, প্রায় কিছু না জেনেই ।

ভাষাকে দিয়ে সবচেয়ে আগ্রাসনটা আসে কিতাবে সওয়ার হয়ে , জ্ঞানচর্চার নাম ভাহিগয়ে । যেমনটা ঘটেছিল বৃটিশ উপনিবেশী শাসনামলে । বুটিশরা এ উপমহাদেশে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা দেয়া আরম্ভ করার পর ইংরেজি বইপত্রের প্রতি বেশ আগ্রহী হয়ে উঠে নানা শ্রেনীর পাঠক। এই চাহিদা মেটানোর জন্য বৃটিশদের লেখা ইংরেজ জাতির ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্পকলা, দর্শন ,গনিত প্রভৃতি নানা বিষয়ক বই সেই সকল বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা ছিল এইযে , ইংরেজ যা ভাবে তা সবচেয়ে ভালো , যা করে তা সর্বশ্রেষ্ঠ , ভারতীয়রা কুসংস্কারাচ্ছন্ন, পশ্চাৎপদ , অলস, অদক্ষ; ইংরেজদের জ্ঞান উন্নত, ভারতীয়দের জ্ঞান নিন্মমানের ৷ ভারতীয়দের উন্নত হতে হলে ইংরেজদের নিকট থেকে শিখতে হবে।

তো, উন্নত হওয়ার আশায় ভারতীয়রা অবশেষে ইংরেজের জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে আরাধ্য ধরে নেয় । নিজেদের হীন বলে বিশ্বাস করতে থাকে । অর্থাৎ ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে তৈরি হয় শক্তিশালী হেজিমনিক সম্পর্ক । এর ফলে প্রায় দুইশ বছর ধরে ভারত শাসন করতে সক্ষম হয় ইংরেজ জাতি । মনোজগতের এই আধিপত্য পয়লা সুই টা ঢুকে ইংরেজি ভাষা প্রব্শের মধ্য দিয়ে । মোট কথা হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস থেকে বোঝা

চন এ

“বাঙালির ইতিহাস চর্চার পথের কীটা ফয়েজ আলমের লেখা গ্রন্থগুলোর

মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ গ্রস্তটিতে

কবি প্রাবন্ধিক ফয়েজ আলম দেরিদার কাঠামোবাদের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ইতিহাস যে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ছাচে আবদ্ধ হয়ে গেছে সে বিষয়ে বিশ্লেষনাত্ববক পর্যালোচনা করেছেন

যায় ভাষিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক আগ্রাসন কিভাবে মনোজগত প্রস্তুত করে দিতে পারে সামগ্রিক আগ্রাসনের চমৎকার উন্মুখ পরিবেশ । “ইতিহাসের দর্শন, উপনিবেশের বাসনা' প্রবন্ধে উপনিবেশের ইতিহাস তৈরি ও শেখানোর প্রসঙ্গে বলেন উপনিবেশ জাকিয়ে বসার পর তারাই একাধারে প্রজাদের প্রতিপালক- শিক্ষক-পথপ্রদর্শকের পদ দখল করে নেয়। নিজেদের লেখা ইতিহাস যাতে প্রজার জাতের প্রতিটি শিক্ষিত মানুষ পড়ে এবং বিশ্বাস করে তার জন্য 'সত্য ইতিহাস ও “বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস' কথাগুলো চালু করে দিয়ে প্রচার করা হয় কেবল তাদের লেখা ইতিহাস সত্য এ বষ্তনিষ্ঠ । বাকিসব মিথ্যা, কিংবদন্তী , গাজাখুরি গল্প

“বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব প্রবন্ধে ফয়েজ আলম বুদ্ধিজীবীর দায় কী? এনিয়ে বলেন. বুদ্ধিজীবী এক পবিত্র যোদ্ধা, প্রধানত ভাষিক অস্ত্রে তিনি যুদ্ধ করেন; যুদ্ধে উপলব্ধিযোগ্য তার অস্তিত্ব এখন, প্রতিনিয়ত, আগামীকাল বা আগামী বছরগুলাতেও ৷ তার দায়িত্ব, ক্ষমতার বিশাল ও হিংস্‌ 'হা'-এর সামনে দাড়িয়ে নির্ভয়ে যথাযথ রীতিতে সত্য উচ্চারণ, মিথ্যার প্রতিবাদ; এবং এইভাবে এসব সংস্থা/ব্যক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি/সম্প্রদায়কে সচেতন করে কার্যকর প্রতিরোধের পটভূমি সৃষ্টি । তিনি আরো বলেন, আমরা এখন বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের যুগে বাস করছি। একদিকে, আমাদের প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দাসত্ব গ্রহণ করেছেন বৈষয়িক প্রাপ্তির আশায়। এদের কাজ হচ্ছে রাজনৈতিক সমাজের শোষণ- দমনপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডকে বিভিন্ন কৌশলে আড়াল করে রাখা এবং মহৎ কর্ম বলে প্রচার করা। আরেকদিকে , সাম্প্রতিকালে গনমাধ্যমের বিরাট বিস্তার ও কারিগরি উন্নতির পরিসরে নয়া-পূজির উন্মেষ সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষজ্ঞ, বিশ্লেষক, পরামর্শক,কলামিস্ট ইত্যাদি বিচিত্র নামের অনেক বুদ্ধিজীবী-দাস। এই দলটিকে বলা যায় সাংগঠনিক বুদ্ধিজীবী । এরা রাজনৈতিক সমাজ থেকে শুরু করে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় সরাসরি নিয়ুক্তি নিয়ে কাজ করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য । ব্যক্তিগত স্বার্থ বলতে সম্মানী, বেতন, ভাতা, প্রকল্প ইত্যাদি নামে প্রদত্ত অর্থও আছে। এই উভয় দলই অত্যন্ত সচেতনভাবে, পরিকল্পনা করে স্বাধীন বুদ্ধিজীবী বিকাশের সবগুলো পথ রুদ্ধ করে রাখে ।

এছাড়াও এই গ্রন্থের অন্যান্য প্রবন্ধ যথা , বাংলা ভাষা বিষয়ে , উত্তর-উপনিবেশী কবিতা : একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকা

এবং আস্তোনিও গ্রামসি : সিভিল সোসাইটি প্রসঙ্গে, প্রবন্ধগুলোয় ফয়েজ আলম উপনিবেশবাদের বিশ্লেষণে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন, যা এদেশের তরুনদের উদ্বেলিত করেছে নতুন চেতনায় ।

“বাঙালির ইতিহাস চর্চার পথের কাটা' ফয়েজ আলমের লেখা গ্রন্গুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । গ্রস্তটিতে কবি প্রাবন্ধিক ফয়েজ আলম দেরিদার কাঠামোবাদের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ইতিহাস যে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ছাঁচে আবদ্ধ হয়ে গেছে সে বিষয়ে বিশ্লেষনাত্বক পর্যালোচনা করেছেন।

গ্রন্থটের ভূমিকায় উনি লিখেছেন ,'উনিশ শতকের কলিকাতায় যে হিন্দুত্ববাদী পুনর্জাগরন ঘইটা যায় ছোট একদল ব্রাহ্মন্যবাদী লেখক-বুদ্ধিজীবীর নেতৃত্বে তার সাথে কোন সম্পর্ক আছিল না মূল বাঙালি জনগোষ্ঠীর-বিপুল সংখ্যাক হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ আমজনতার ৷ তবু এই সংখ্যালঘুরাই সাম্প্রদায়িক আবেগে উদ্বুদ্ধ হইয়া ধর্মীয় পুরান,

ধর্মীয় লোককাহিনির অনেক গালগল্পেরে ইতিহাস হিসেবে চালায়া দিতে পারছে আমাদের দেশের সাধারন মানুষের জানবুঝের জগতে । আর , যুগে যুগে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা সেইগুলারেই পুনরুৎপাদন করছে, বানোয়াট বয়ানগুলারে যাচাই না কইরাই ৷ এইসব বানোয়াট, সাম্প্রদায়িক আবেগপ্রসূত বয়ান এখন ইতিহাসের অংশ হিসাবে জারি থাইকা আমাদের যৌথ সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনীশক্তিরে একটানা কাইটা যাইতেছে গোপন ঘুনের মত ।”

গ্রন্থটের ১৮ নং পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন. বৃটিশ উপনিবেশ কায়েম হওয়ার পর ইংরেজরা সহযোগী হিসাবে বাইছা নেয় তাদের সাথে সম্পর্কিত তথাকথিত উঁচা জাতের হিন্দুদেরকে। এই ক্ষদ্র ব্রাহ্মন্যবাদী গোষ্ঠীটি আগে মুসলমান প্রশাসক-কর্মকর্তাদের মোসাহেবি করতো । পরে ইংরেজদের হাতে ক্ষমতা পড়লে খাপ খাওয়ায়া নিতে সময় লাগে না তাদের । এর ফলে অর্থবিত্ত কামানির সুযোগ পাওয়া যায়। আর , সাড়ে পাচশ বছরের মুসলিম শাসনে জমা হওয়া ক্ষোভ-দুকখ-থিন্না জাহির করার মওকা পায়া কৃতজ্ঞ বোধ করে তারা । কৃতজ্ঞতার ভাষা অনেক সময় হয়া উঠে শর্তহীন গোলামির ভাষা ৷ কেউ কেউ সেইটা খোলাখুলি প্রকাশও করেন । যেমন রামমোহন রায়(রাজা) প্রেস রেগুলেশনের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের রাজার কাছে এক আবেদনে লেখেন: এঁসব অত্যচারীর জোয়ালটা ভাইংগা ফেলা আর নির্যাতিত হিন্দুদের আশ্রয় দেয়ার জন্য ভগবান তার অসীম দয়ায় শেষ পর্যন্ত ইংরেজদেরকে উস্কায়া দিছেন ।... আমরা) আপনার কর্তব্যপরায়ন প্রজারা ইংরেজদের বিজেতা মনে করি না, মনে করি আমাদের বাচাইনাঅলা । আপনারেও আমরা কেবল রাহা ভাবি না, আমাদের বাচাইনেঅলা আর, বাপের মত দেখি(া001 যম, ১৮৮৫:৪৪০)।

এই জায়গায় ভাষার দিকে খেয়াল দেয়া দরকার একটু: 'আমরা... ইংরেজদের বিজেতা মনে করি না * এবং “* আমাদের বাঁচাইনাঅলা আর বাপের মতো দেখি'। স্বার্থের প্রশ্নে আত্মসম্মান বা জাতিগত সম্মান যেন কিছু না। এইভাবে এক জায়গায় আইসা মিইলা যায় উপনিবেশক ইংরেজদের উদ্দেশ্য আর তাদের সহযোগী ব্রাহ্মন্যবাদী ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটির স্বার্থ”

এইভাবে বাঙালির ইতিহাস চর্চায় দেখা যায় বৃটিশদের বদান্যতায় একশ্রেণীর ব্রাহ্মণ্যবাদীরা মুসলিমদের খাটো করে নিজেদের ধর্মের পূরানভিত্তিক কল্পিত ইতিহাস রচনা করে ইংরেজ প্রভুদের উচ্চাশনে বসিয়ে এদেশের মানুষদের নৈতিক্ভাবে দূর্বল করে রেখেছে । দীর্ঘদিন ধরে বলা হয় বাঙালি মিশ্র জাতি অথচো " ডিএনএ পরীক্ষা কইরা দেখা গেছে বাংলাদেশের মানুষের শরীরে গড় পড়তায় ৯ ধরনের ওয়াই ডিএনএ হ্যাপলোগ্রুপ পাওয়া গেছে(17া1 ঢ] ৪0. ২০১৬:৫৯৩-৫৯৯)। ভারতের ব্রাহ্মনদের শরীরে পাওয়া গেছে ১২টা ওয়াই ডিএনএ হ্যাপলোঞ্চপ()180 1, দা. ২০০৯: ৪৫-৫৯)। অর্থাৎ ব্রাহ্মনদের রক্ত ঠিক বারোয়ারি রক্ত। যার অর্থ হইল ব্রাহ্মনদের মধ্যেই বেশি মিশামিশি হইছে ।”

ফয়েজ আলমের এমন তথ্যভিত্তিক আলোচনায় তরুন সমাজ উপলব্ধি করেছে কিভাবে তাদের ইতিহাসকে বিকৃত করে হীনমন্যতায় ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল ।

“কবি ফয়েজ আলমের সাথে আলাপ' কবি আসমা সুলতানা শাপলা'র নেওয়া এই সাক্ষাৎকার গ্রন্থে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে তবে নতুন যে বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ'র 'লাল সালু ও *। ফয়েজ আলম বলেছেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌...তিনি মজিদকে নির্মাণ করেছেন চারপাশের বাস্তবতা- বর্জিত এক নিঃসংগ চরিত্ররূপে। ১৯৪৮ সালে লেখা এ উপন্যাসে পটভূমি তিরিশ- চল্লিশের দশকের ধরে নিতে পারি। তখনকার সমাজে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের একটা বড় কারণ ছিল জমিদার-তালুকদার-জোতদারদের শোষন-নিপীড়ন। এরপর সুদখোর মহাজন, সমাজের প্রতিপত্তিশালী মানুষ । লাল সালু উপন্যাসে এরা নাই। সেইখানে মানুষের সর্বনাশের একমাত্র কারণ যেন মজিদের মতো ভূয়া পীর । শোষক, রাজনীতিবিদ, জমিদার-তালুকদার-জোতদার-সুদখোর মহাজনদের নিয়ে যে গ্রামীণ সমাজকাঠামো সেই সমাজের বড় শয়তানদের মাঝখানে মজিদ চরিত্রকে দীড় করালে দেখা যেতো মজিদ এক পেটি শয়তান। এই কারণে মজিদকে দাড় করানো হয়েছে এমন এক সমাজে যেখানে রাজনীতিবিদদের দৌরাত্ম্য নাই, জমিদার-তালুকদার-জোতদার-সুদখোর মহাজনদের শোষণ-নিপীড়ন নাই; কেবল আছে ধর্মব্যবসায়ী মজিদের নির্যাতন । ফলে উপন্যাসটি পড়ার সময় পাঠক অসচেতনভাবে সমাজের যাবতীয় দুর্ভোগের উৎস হিসাবে মজিদকেই চিহ্নিত করে। তাদের চোখে পেটি শয়তান মজিদ হয়ে উঠে এক বিরাট শয়তান । মজিদের এই অবস্থানের কারণে পাঠকের ক্ষোভ মজিদের ভন্ডামির উপর থেকে উপচে পড়ে পীরালি এমনকি ইসলাম ধর্মের প্রতিও ধাবিত হয়। এভাবে মজিদ হয়ে উঠে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের পীরগোষ্ঠীর এক ছাঁচ , ওয়ালীউল্লাহ্‌ সেই ছাঁচ ঢালাই করে দেন মজিদ-চরিত্রের আশ্রয়ে ।

এই যে ছাচ নির্মাণ, নমুনা বানানো, পরে সেইটা একটা জাতি বা গোষ্ঠীর সাধারণ স্বভাব হিসাবে চালিয়ে দেয়া, সেই কায়দাটা ব্যবহৃত হয় সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েমের কাজে। যেমন বাঙালি অলস, মিথ্যুক ,ভীরু এইসব কথা চালু হয়েছিল কোন একটা বা দুটো বিশেষ চরিত্রের ছাঁচ নির্মাণের মধ্য দিয়ে । এইসব কথা পরস্পরাক্রমে চলতে থাকে আর সেই জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম নেয় হীনম্মন্যতা, আত্মগ্লানি, নিজের এঁতিহ্য

আজি

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌...তিনি মজিদকে নির্মাণ করেছেন চারপাশের বাস্তবতা-বর্জিত এক নি্সংগ চরিত্ররূপে। তখনকার সমাজে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের একটা বড় কারণ ছিল জমিদার-তালুকদার-জোতদারদের শোষন- নিপীড়ন । এরপর সুদখোর মহাজন, সমাজের প্রতিপত্তিশালী মানুষ। লাল সালু উপন্যাসে এরা নাই। সেইখানে মানুষের সর্বনাশের

একমাত্র কারণ যেন মজিদের মতো ভুয়া গীর

আর পূর্বপুরুষদের অর্জনের প্রতি ধিক্কার । ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসের প্রশংসা করার আগে এইগুলাও মাথায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে তিনি মজিদ নামে একটা ছাঁচ তৈরি করে দিয়ে গেছেন। অনুকরণপ্রিয় অমেধাবী লেখকরা সেই ছাঁচ থেকে ডজন-ডজন মজিদ বানিয়েই চলেছে এবং দাড় করিয়ে দিচ্ছে নিজের সমাজ তথা নিজেরই বিরুদ্ধে ।

এরই ফলশ্রতিতে আমরা দেখতে পাই স্বাধীনতার পরবর্তীতে উপন্যাস, গল্প, কবিতা, নাটক, সিনেমায় খল চরিত্রে একজন দাড়ি-টুপিওয়ালকে। এইভাবে দাড়ি-টুপিওয়ালা খল চরিত্র শেষ পর্যন্ত নামাজপড়া মুসলিমদের ধিরে ধিরে পয়েন্ট করা শুরু করে এবং এই সমাজের মনম্তত্তে ঢুকে যায় । এই মনস্তাত্ত্বিক চেতনাকে পূজি করেই স্বৈরাচার শেখ হাসিনা কল্পিত মৌলবাদি বা ইসলামোফবিয়া ন্যারেটিভ তৈরি করেছিল এবং নিজেকে বানিয়েছিল রক্ষাকর্ত' আর একাজে তাকে ভ্যানগার্ডের মতো অভিভাবকের মতো আগলিয়ে রেখেছিল কথিত পার্শ্ববতী একটা বন্ধুরাষ্ট্র।

কবি প্রাবন্ধিক অনুবাদক ফয়েজ আলমের লেখালেখি , সাক্ষাৎকার, বক্তব্যগুলো এদেশের তরুন সমাজের কাছে এই 'ক্রিটিকাল চিন্তাধারা'কে সহজ করে বুঝতে সাহায্য করে। এদেশের তরুন সমাজ স্বাধীনতা পরবর্তী তৈরিকৃত সাংস্কৃতিক আধিপত্য ভেঙ্গে ধিরে ধিরে প্রস্তুত হয় আলটিমেট লক্ষ্যের দিকে; অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, 'জুবলাই ২৪!

কবি প্রাবন্ধিক অনুবাদক ফয়েজ আলম “জুলাই ২৪' এর এক অনন্য অনুঘটক ৷ যিনি কাজ করে যাচ্ছেন নিভৃতে ৷

তাকে ধন্যবাদ দেয়া যেতেই পারে।

তথ্যসুত্র : বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ত্ব -ফয়েজ আলম ।

ভাষার উপনিবেশ- ফয়েজ আলম।

উত্তর-উপনিবেশী মন- ফয়েজ আলম।

উত্তর উপনিবেশি তাত্ত্বিক কবি ফয়েজ আলমের সাথে আলাপ-আসমা সুলতানা শাপলা । কাভারিং ইসলাম (মূল এডওয়ার্ড সাঈদ) অনুবাদ ফয়েজ আলম ।

অরিয়েন্টালিজম (মূল এডওয়ার্ড সাঈদ) অনুবাদ ফয়েজ আলম ৷ &

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হবে।

এখনও কোনো প্রকাশিত মন্তব্য নেই।