সাহিত্য ও সংস্কৃতি
ইতিহাস ঐতিহ্য · Site Administrator · 2026-10-19

ক্যালকাটা হেয়ার কাটিং সেলুন, ৭৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান

রাবেয়া খানম

দড়াটানা মোড়ের ব্যস্ত ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট সেলুন। বয়স তার স্বাধীন বাংলাদেশেরও বেশি। দেশভাগ দেখেছে, মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে, বদলে যেতে দেখেছে মানুষের চুল কাটার ধরন। তবু ৭৮ বছর ধরে টিকে আছে ক্যালকাটা হেয়ার কাটিং সেলুন।

যাত্রার শুরুটা কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় । সেখান থেকে যশোর শহরের দড়াটানা ৷ এ বঙ্গে ৭৮ বছরের পথ চলা । ভারত ভাগেরও আগে সেলুনটির গোড়াপত্তন হয়। এক সময়ের জৌলুস হারালেও প্রতিষ্ঠানটি স্বগৌরবে টিকে আছে এখনো ৷ যশোর শহরের দড়াটানায় এসে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে সেলুনটি দেখিয়ে দেন।

কেশবিন্যাসের নিপুণ কারিগর হিসেবে সুনাম ছিল গনি মিয়ার দক্ষতার জন্য ছিলেন সুপরিচিত । ব্রিটিশ ভারতের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তারা যখন লন্ডন ও আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেতেন ক্ষৌর কর্মের জন্য তাকে সঙ্গে নিতেন। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের দুইশ বছরের অবসান ঘটে । ভারত ভাগ হয়। ভারত-পাকিস্তান ভাগের জেরে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকা থেকে সপরিবারে যশোরে চলে আসেন গনি মিয়া । শহরের শংকরপুরে নিবাস গড়ে তোলেন । জীবন জীবিকার জন্য কালেক্টরেট ভবনের সামনে দড়াটানা মোড়ে একটি দোকানঘর ভাড়া নিয়ে আবারো একটি সেলুন গড়েন প্রতিষ্ঠানটির নাম দেন ক্যালকাটা হেয়ার কাটিং সেলুন ।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আক্রান্ত হয় সেলুনটি ৷ মর্টার সেলের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়। আগুন লেগে দুই ঘণ্টা ধরে পুড়তে থাকে । তবে এতেও দমে যাননি গনি মিয়া । যুদ্ধপরবর্তী স্বাধীন দেশে ক্যালকাটা সেলুনকে আবারো নতুন করে গড়ে তোলেন বলে আলাপচারিতায় জানান, ক্যালকাটা সেলুনের বর্তমান স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম। শফিক গনি মিয়ার নাতিদের একজন ।

শফিকুল ইসলাম শফিক জানান, দাদা গনি মিয়ার মৃত্যুর পর ক্যালকাটা সেলুনের হাল ধরেন তার বাবা মোহাম্মদ সিদ্দিক । তার বাবা ছিলেন দাদার বড় ছেলে ৷ শফিক জানান, তার বাবা নিজ দক্ষতায় কারিগরদের নিপুণ করে গড়ে তোলেন। যার কারণে বাবার সময় সেলুনটি যশোরের মধ্যে নামকরা ছিল। সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল। এখনো সেটি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ক্যালকাটা সেলুন থেকে কাজ শিখে বহু কারিগর পরবর্তীতে নিজেরা আলাদা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন।

গনি মিয়া ১০ জন কারিগর ও ১০টি চেয়ার নিয়ে ক্যালকাটা সেলুনের যাত্রা শুরু করেন। নিজের দক্ষতার ছাঁচে কারিগরদের গড়ে তোলেন । কলকাতার মতো যশোরেও অল্প কিছুদিনের মধ্যে ক্যালকাটা হেয়ার কাটিং সেলুনের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ।

শহরের প্রবীণ নাগরিক আমজাদ হোসেন বলেন, ক্যালকাটা সেলুনের সেবার মান ছিল খুবই ভালো। হেয়ার কাটিং ও স্টাইলে সেলুনটির কারিগররা ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। ক্ষৌরকর্মে সবচেয়ে ভালো ও মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতেন তারা৷ পাথরে সক্কুর ধার দিয়ে হাতের কারিশমায় ত্বককে করে তুলতেন মসৃণ । তিনি জানান, তখন সেভিং ক্রিম একটি কৌটার মধ্যে থাকত । সেখান থেকে ব্রাশে করে নিয়ে মুখে লাগানো হতো । কাঁচি হাতে কারিগরেরা চুল ছাঁটতেন দক্ষতার সাথে ।

যশোরের প্রবীণ ব্যক্তিদের আরো অনেকের বক্তব্যও

এরকমই । তারা বলেন, উন্নত ও মানসম্পন্ন সেবার মধ্য দিয়ে একসময় পাকা-পোক্তভাবে দাড়িয়ে যায় সেলুনটি ।

মো. সিদ্দিকের মৃত্যুর পর সেলুন পরিচালনার দায়িত্ব নেন তার ছেলে শফিকুল ইসলাম শফিক । সেলুনের পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ব্যবসায়ের সাথে সম্পৃক্ত । সেবামূলক কাজের মাধ্যমেও সুনাম কুড়িয়েছেন। নিজের অন্যান্য ব্যবসায়ের পাশাপাশি দীর্ঘ ৩০ বছর ক্যালকাটা সেলুনের হাল ধরে রেখেছেন।

শফিক জানান, এঁতিহ্য ও সুনামকে ধরে রাখতে এখনো প্রতিষ্ঠানটি চালু রেখেছেন। বর্তমানে চারজন কারিগর সেলুনটিতে কর্মরত ৷ বহু পুরাতন খদ্দেররা এখনো নিয়মিত এই সেলুনেই আসেন । প্রতিষ্ঠানটির সাথে এসব কাস্টমারদের এক ধরণের আত্মিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে তারা অন্য কোথাও চুল কাটতে ও দাড়ি কামাতে যান না। শফিক জানান, বেশ কিছুদিন আগে একদিন ষাটোর্ধ্ব এক নারী সেলুনে আসেন । সঙ্গে তার স্বামী ছিলেন । ওই নারী তাকে বলেন, বাবা, সেলুনের একটা ছবি তুলতে পারি? কারণ জানতে চাইলে তিনি আবেগ আপগুলুত হয়ে বলেন, ছোটবেলায় বাবার সাথে ক্যালকাটা সেলুনে চুল কাটাতে আসতাম । এখন লম্ডন প্রবাসী । ছেলে-মেয়েরাও সব লন্ডনে থাকে৷ ছোটবেলার স্মৃতিমাখা এই ক্যালকাটা সেলুনের ছবি ফ্রেমবন্দি করে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের দেখাতে চাই।

দড়াটানা মোড়ে এ সেলুনটির অবস্থান হওয়ায় একসময় ভিড় লেগেই থাকত । সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সবাই এখানে আসতেন । প্রয়াত মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম ও এমপি খালেদুর টিটো, আ্যাডভোকেট রবিউল আলমসহ আরো অনেকে এই সেলুনে আসতেন।

সময়ের পালা বদলে স্কুর, কাঁচি, জোড়া কলপ আর কৌটার সেভিং ক্রিমের স্থান দখল করেছে নানা রকমের ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি । ক্যাটালগ নির্দিষ্ট হেয়ার কাটিং ছাড়িয়ে চলছে ব্যক্তির রুচিমাফিক হেয়ার কাটিং স্টাইল । আছে হারবাল, গোল্ডসহ নানা ধরনের ফেসিয়াল, ব্রণ ট্রিটমেন্ট, নেইল সেলিং ও স্টিম থেরাপিসহ জেন্টসদের জন্য আধুনিক পার্লারের সুবিধাগুলো ৷ ফলে এতকাল পরেও ক্যালকাটা হেয়ার কাটিং সেলুন ইতিহাস ও এতিহো্যের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে স্বমহিমায় ।

ক্যালকাটা হেয়ার কাটিং সেলুনের কারিগররা জানান, এক সময় চুল-দাড়ি কাটার দাম নেওয়া হতো তিন আনা ও চার আনা । বর্তমানে এখানে সেভ করতে ৫০ টাকা ও চুল কাটাতে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। সুনাম ও দীর্ঘ দিনের অভ্যাসের বশে অনেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা রিকশা ভাড়া গুনে এখানে চুল কাটাতে ও দাড়ি কামাতে আসেন । যশোরে ভালো সেলুন বলতে একসময় সবাই একনামে ক্যালকাটা সেলুনকে চিনতেন তখন নতুন কোনো হেয়ার কাটিং স্টাইলের প্রচলন হলে প্রথমেই সবাই ক্যালকাটা সেলুনে এসে এ বিষয়ে খোঁজ করতেন। যত কঠিন আর ফ্যাশনেবল হেয়ার কাটিং স্টাইলই হোক না কেন, সেটি ক্যালকাটা সেলুনেই মিলত ।

শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, ইতিহাস ও এঁতিহ্যকে ধারণ করে বংশ পরম্পরায় প্রতিষ্ঠানটিকে ধরে রেখেছি। আরো উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করবো বলে পরিকল্পনা রয়েছে। সেলুনটি দ্রুতই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও যশোরের মধ্যে সর্বোচ্চ মানের সেলুন হিসেবে গড়ে তোলা হবে । ঙ

মন্তব্য করুন

মন্তব্যটি পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হবে।

এখনও কোনো প্রকাশিত মন্তব্য নেই।