ল্যান্ড ফোনে মিস কল
মো. মুশফিকুর রহমান
নীলা আপু সুগন্ধি ছড়িয়ে বের হলেই শাহীন ভাই পিছন পিছন হাটা দিতেন । যাওয়ার সময় বলতেন, বয়েজ গুডবাই । কাল আবার দেখা হবে। এনজয়।
নীলা আপু আমাদের পাড়ার এঁশরিয়া। আসলেই কি এত সুন্দর ছিলো নাকি তখন দেখার চোখটাই এমন ছিলো, মাঝে মাঝে চিন্তা করি
নীলা আপু ঘাড় কাত করে দেখে নিতেন শাহীন ভাইয়ের অবস্থান
আমি তখন কলেজে পড়ি । পাড়ার ছেলে ছোকরা গুলোকে নিয়ে গলির ভিতর ক্রিকেট খেলতাম নিয়মিত।
গলিটাই আমাদের প্রাণের স্টেডিয়াম।
বিকেল হলেই সরু গলিটা একটা বিরাট মাঠে পরিণত হত রাস্তার দুই পাশের বাসাগুলো থেকে স্কুল কলেজ পড়ুয়া পোলাপান গুলো চোখ কচলাতে কচলাতে এসেই ব্যাট হাতে দাড়িয়ে পড়তো, না হলে বল হাতে দৌড় ।
এলাকার বড় ভাই শাহীন ভাই , গলির মাথায় দীড়িয়ে থাকা তিতাস গ্যাসের রাইজারটার উপর এক পা তুলে দাড়িয়ে থাকতো । সবাই না বুঝলেও আমি ঠিকই বুঝতে পারতাম কার জন্য এক পায়ে খাড়া ।
নীলা আপু সুগন্ধি ছড়িয়ে বের হলেই শাহীন ভাই পিছন পিছন হাটা দিতেন । যাওয়ার সময় বলতেন, বয়েজ গুডবাই ৷ কাল আবার দেখা হবে। এনজয় ।
নীলা আপু আমাদের পাড়ার এঁশরিয়া। আসলেই কি এত সুন্দর ছিলো নাকি তখন দেখার চোখটাই এমন ছিলো , মাঝে মাঝে চিন্তা করি।
নীলা আপু ঘাড় কাত করে দেখে নিতেন শাহীন ভাইয়ের অবস্থান ৷ জিঙ্সের পকেটে হাত দিয়ে যখন শাহীন ভাই হাসিহাসি মুখে এগিয়ে যেতেন, সে এক দেখার মতন দৃশ্য ৷ পিচ্চিগুলোর এদিকে মনোযোগ দেয়ার সময় কই। তাছাড়া এতটা বুঝতে পারার বয়সও হয়নি।
আমি তখন শাহীন ভাইয়ের জায়গায় নিজেকে দেখি, আর নীলা আপুর জায়গায় ইফা । ইফা হাটছে।
পাড়ার সবচেয়ে দুষ্টু ছেলে রিদাদ কাছে এসে বলছে, আপু তোমাকে হ্যাব্বি লাগছে। ইফা ঘাড় ঘুরিয়ে বলছে, ও তাই!
মেয়েদের ঘাড় বাকা করে, * ও তাই!
একই সতর্কতা । আমাদের আবহাওয়া অফিসের সতর্ক বার্তার মতন।
মিলা আন্টির সেলাই মেশিনের শব্দ আমাদের চেঁচামেচিতে কোথায় মিলিয়ে যেত বুঝতেই
পারতাম না।
আমাদের পাড়াটা ছিলো খুবই নিরিবিলি । সবগুলো বাসার সামনেই একটা দুইটা গাছ।
সবার মধ্যে ভীষণ আন্তরিকতা ৷ শহর হলেও একটু গ্রাম গ্রাম আমেজ ছিলো সব কিছুতেই ।
ইফাদের বাসার সামনে একটা পুরোনো বকুল গাছ। বাড়ীটাও বেশ পুরোনো ।
দু'একটা বাড়ী এখনো টিনশেড ৷ খালেক চাচার ঘরটা মাঝামাঝি । বলটা টিনের উপর
পড়লেই ঝনঝন শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠতো । দৌড়ে খালেক চাচা বাইরে এসে
চেঁচাতে চেঁচাতে বলতেন, তোরাতো দেখতেছি আমার টিন ফুটা করে ছাড়বি বাপ ।
কে শুনে । সবাই খেলায় মহা ব্যস্ত ।
রামিম, শামীম দূর থেকে আস্তে করে বলতো , চাচা ভাংগা ঘরে আর ক'দিন, বিল্ডিং কইরা
ফালান। মেয়ের জামাইরে ভাংগা ঘরে রাখবেন, বলেই হাসতে হাসতে বল হাতে দৌড় ।
তৃপ্তি জানালার কাছে বসে হাসতো, আমাদের রেগুলার দর্শক । খেলা দেখাটা বাহানা
মাত্র
খালেক চাচার মেয়ে ৷ রামিম ওকে খুব পছন্দ করে।
রামিম জোরে জোরে চেঁচাতো , আসলে চেঁচানো না, যেন তৃপ্তি কে ডাকছে। ঠিক তখনই
তৃপ্তি এসে জানলায় দীড়াত। একটুও দেরি হতো না. । কি অসাধারণ টাইমিং ৷ যেন ব্রায়ান
লারা লুজ বলে সিক্স মারছে। অতঃপর তার সব চেঁচামেচির যবনিকা ৷ চোখে চোখে কি
যেন কথা হতো । শুধু ওরাই বুঝতে পারতো ৷ ওদের ভাষা ওরাই পড়তে পারতো ।
প্রিয় মানুষের চোখেমুখে কিছু স্বরলিপি থাকে । সহজেই সুর তোলা যায়।
মনে হতে মুখের চেয়ে চোখে অনেক বেশী কথা বলা যায়। চোখের এক ইশারায় জগতের
সকল গল্প বলা শেষ।
আমাদের খেলা তখন তুঙ্গে, মহল্লার মেয়েগুলো বল-ব্যাটের মাঝখান দিয়ে কেমন
ক্যাটওয়াক করতে করতে হেঁটে যেতো। ভাব দেখে বুঝতে পারতাম বেশ মজা পাচ্ছে। ঘাড় বাকা করে আড়চোখে দেখছে
বলাটা যে কতটা শৈল্পিক চাক্ষুষ না দেখলে অনুভব করা যাবে না। আমি তখন, ইফার হাত ধরে কল্পনার হাওয়ায় ভেসে ভেসে চলে যাই মেঘেদের দেশে ৷ মেঘের গায়ে হাত ছুঁই, ঠান্ডা বুলিয়ে দিই ইফার কপোলে। পিচ্চগুলোর চেচামেচিতে সম্বিৎ ফিরে পাই, রনি ভাইয়া কিপিং কিপিং। এর মধ্যে কতগুলো বল পিছন দিয়ে চলে গেছে টেরই পাইনি । সামনে দিয়ে কল্পনার ইফা, পিছন দিয়ে বল চলে যায়, আমার কিছুই ধরা হয় না।
না বল, না ইফা। মিলা আন্টি টিনশেড ঘরের জানালার পর্দা ফাকা করে বলতেন, দেখিস বল যেন আমার
জানালায় না আসে। আমার মেশিনে না লাগে। কোনদিনই বল উনার ঘরের জানালা ভেদ করেনি। তাও নিয়মিত একই ডায়লগ ।
আমাদেরকে, এটা লুকানোর চেষ্টা করলেও আমরা ঠিকই বুঝতে পারতাম ।
আমি অপেক্ষা করে থাকতাম ইফা কখন বের হবে। বিকেলে ইফা প্রাইভেট পড়তে যেতো । প্রতিদিন নিয়ম করে একটা সময় বের হতো।
উইকেট টাও ওদের বাসার ঠিক গেইট বরাবর দাড় করাতাম। আমার পজিশন কিপিং এ। উইকেটের পিছন থেকে মনোযোগ সব গেইটের দিকে । কখন বের হয়। ইফা বের হলেই আমার সব চেঁচামেচি শেষ।
ছোট গলি সবাই সবার পরিচিত । ইফা আমার কাছে আরেকটু বেশী পরিচিত ।
সবাই চোখ দিয়ে চিনলেও, আমি মন দিয়ে চেনার চেষ্টা করেছি।
ইফার প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মতন বয়কাট চুল। প্রায়ই সাদা জামা পরে বের হতো। মনে হতো একখণ্ড শুভ মেঘ চোখের সামনে দিয়ে উড়ে গেলো । অপলক তাকিয়ে কোথায় যেন
হারিয়ে যেতাম।
সাদা জামায় এত সুন্দর মানুষ আমি জীবনে কখনো দেখি নাই। মাঝে মাঝে মনে হতো
পৃথিবীর সব শুভ্রতা শুধু ইফার জন্য ।
মানুষের সাথে গল্প করায় আমার জুড়ি ছিলো না। আড্ডা জমিয়ে দেবার সব রস ও রসদই
আমার চোখেমুখে, কথাবার্তায় ছিলো । কিন্তু মজার ব্যাপার হলো,
ইফার সামনে পড়লে আমার সব জারিজুরি লাপাত্তা । সেতা, মিতা, জলি সবার সাথে
কত ইয়ার্কি করতাম, ইফা সামনে এলেই বোকা বোকা হয়ে যেতাম । মুখে কোন বোল
নেই, একদম তালা ।
বাসা থেকে বের হয়ে ইফা হনহন করে হেঁটে চলে যেতো ৷ ভাবটা এমন যে আমাকে
দেখছেই না। ইচ্ছে করেই করতো নাকি আমার এটেনশন নেয়ার চেষ্টা করতো বুঝতে
পারতাম না। আমি চাতকের মতন অপেক্ষা করতাম, একটা কথা বলুক ।
আমার অপেক্ষা শেষের কবিতার শোভনলালের মতন অপেক্ষাই থেকে যেতো ৷ ইফা
একদিনও মুখ ফুটে বলেনি, কেমন আছেন? কিংবা ধমকের সুরেও বলেনি, এটা খেলার
জায়গা? মাঠে গিয়ে খেলা যায় না! ইত্যাদি। আমি চাইতাম বলুক বলত না।
ভালো মেয়ে হিসাবে ইফার বেশ সুনাম মহল্লায়। আচরণে , পড়ালেখায় অন্যদের থেকে
একেবারেই আলাদা । অনন্যা ।
তৃপ্তি যেমন সারাদিন জানলার পাশে বসে থাকে, ছেলেদের সাথে খাতির জমানোর জন্য ।
আমাকে দু'একবার খুঁচিয়েছে। পাত্তা না পেয়ে রামিমকে বশ করেছে। মহল্লার অনেকেই
জানে।
ইফা এমন না। একেবারেই আলাদা ।
আমি কোনভাবেই কাছে যেতে পারছি না। সম্ভবত ওর প্রতি দুর্বলতার কারণেই আরো ₹কুচিত হয়ে যেতে থাকলাম । আমার মাঝে আরও আড়ষ্টতা ভর করতে লাগলো ।
এভাবে হবে না। মনে মনে ফন্দি ফিকির করতে লাগলাম কিভাবে কথা বলা যায়।
ল্যান্ডফোনই ভরসা । বাসার ফোনগুলো নিশ্চয়ই ইফাই রিসিভ করে । মাথার মধ্যে ইফা
ছাড়া আর কিছু নাই। অল্প বয়সে প্রেমে পড়লে যা হয় আর কি। সব ভাবনাই মনে হয়
ঠিক । যেই ভাবনা সেই কাজ।
একদিন ইফার ছোট ভাই ইফতির কাছ থেকে বাসার ল্যান্ড ফোনের নাম্বার কায়দা করে
নিয়ে নিই । ইফতি আমার টিমের খেলোয়ার ।
মুশকিল হলো ফোন কিভাবে করবো । সাহসে কুলাচ্ছে না। যদি ওর বাবা মা কেউ ফোন
রিসিভ করে, কি বলবো!
ইফতির কথাও বলা যাবে না, তখন সন্দেহ আরও বাড়বে ।
তাছাড়া মহল্লায় একটা গুঞ্জনও রয়েছে আমাকে আর ইফাকে নিয়ে। এই গুঞ্জন
নিশ্চিতভাবেই ওর বাবা মার কর্ণগোচর হয়েছে।
ঘরে সুন্দরী মেয়ে থাকলে এমনিতেই বাবা মা একটু টেনশনে থাকেন । আমি ফোন করা
আজি
দরূদ পড়ে টেলিফোনটা কাছে নিয়ে বস- লাম। এনালগ সেটে আংগুলের খোঁচা মেরে মেরে সবগুলো নাম্বার ডায়াল করে বুকে থুথু দিয়ে অপেক্ষা করছি। রিং হচ্ছে।
ওপাশ থেকে শুনা গেলো, হ্যালো, কাকে চাচ্ছেন? এমন মধুর কণ্ঠে হ্যালো আমি কোনদিন শুনিনি। মনে হলো কলকল ধ্বনিতে জলের ধারা বয়ে গেলো
হৃদয়ের বিরি বেয়ে..
মানেই তাদের এই টেনশনের পারদটা দ্রুত উঠা নামা করতে থাকবে । তারাও বিশ্বাস শুরু করবে আমার সাথে ইফার কিছু একটা চলছে। আসলে তেমন কিছুই না। ইফতি আমার কাছ একটু আলগা খাতির পায় এটাই গুঞ্জনের মূল কারণ ৷ একথা কে বুঝাবে। ততদিনে কোথাকার পানি কোথায় চলে যাবে। মা বাবার কাছে বিচার যাবে।
দূর থেকে পূর্ণিমার চাদ দেখার মতন খেলার ছলে দেখা হয়। জানাজানি হয়ে গেলে দেখাটাও বন্ধ হয়ে যাবে।
মাথায় কিছুই আসছে না। কি করবো ভাবতে ভাবতে সাহসের দেবতা এসে কানে কানে বললো , ভয় পেয়ে জীবনে কেউ কিছু করতে পারে নি। সাহসী হও বৎস। যথেষ্ট বড় হয়েছো।
মনে মনে সাহসের বীজ বপন করে, একদিন বিকেলে দোয়া দরূদ পড়ে টেলিফোনটা কাছে নিয়ে বসলাম । এনালগ সেটে আংগুলের খোঁচা মেরে মেরে সবগুলো নাম্বার ডায়াল করে বুকে থুথু দিয়ে অপেক্ষা করছি। রিং হচ্ছে।
ওপাশ থেকে শুনা গেলো, হ্যালো, কাকে চাচ্ছেন? এমন মধুর কণ্ঠে হ্যালো আমি কোনদিন শুনিনি। মনে হলো কলকল ধ্বনিতে জলের ধারা বয়ে গেলো হৃদয়ের ঝিরি বেয়ে , পাগলা ঝোড়া থেকে নেমে এসেছে সেই জলধারা ।
আমি কিছু বলতে পারলাম না। কাউকে ভালোবাসলে বুঝি মানুষ এমনই নির্বাক হয়ে যায়।
এই পাড়ার সব মেয়ে ছেলেদের সাথে আমি মজা করি, খোঁচা মারি, দুষ্টামি , সিরিয়াস নেস সব ই দেখাই ।
ইফার সাথেই পারি না। ইফা আবার বললো , কাকে চাচ্ছেন? আমি বলতে পারিনি, আমিতো তোমাকেই ফোন করেছি। কেনো বুঝতে পারছো না! ওর কি বোঝার কথা! কয়েকবার হ্যালো:হ্যালো! বলে ইফা ফোনটা রেখে দেয়।
ফোন রাখার খটাস শব্দটা আমার বুকে হাতুরি পিটার মতন লাগলো ।
এর মধ্যে আমার রেজাল্ট হয়ে যায়। কোচিং এ ভর্তি হয়ে খেলাধুলায় মনোযোগ কমিয়ে দিই । রাতদিন পড়াশুনা । ইফার সাথে দেখা হয় না।
পরীক্ষায় পাস করার চেয়ে ভর্তি হওয়াটা অনেক বেশী চ্যালেঞ্জের। তাও আবার মেডিকেলের ভর্তি । এর মধ্যেই ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট হয়।
ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যাই আমি । মহল্লায় সবার মুখে মুখে, আমি মেডিকেলে চান্স পেয়েছি। সিরিয়াল এসেছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ।
যাওয়ার আগে মনে ধুড়ধুড়ি অচেনা জায়গা, অজানা পরিবেশ, নতুন সব মানুষ । আর বিকেল হলে ইফাকে মিস করা।
ময়মনসিংহ যাওয়ার আগে হঠাৎ রাস্তায় ইফার সাথে দেখা ৷ ওদের বাসার সামনে । দুপুর বারোটা হবে । নিরিবিলি চারপাশ । মনে হলো ইফা আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলো । গেটে দাড়িয়েই বললো, ঢাকা মেডিকেলে হলো না?
আমি স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে গেলাম, আমার জন্য কেউ ভাবছে! তাও আবার ইফা! নিজের কানকে বিশ্বাস হলো না, আস্তে করে বললাম, আমি এত ভালো ছাত্র না।
- খেলাধুলা কমিয়ে আরেকটু চেষ্টা করলেই হতো ।
- তুমি চেষ্টা করো এখন থেকেই ।
- আমি মেডিকেলে পড়বো না, ইফা বললো ।
- কেনো? আমি ভর্তি হলাম তাই। কেন যে এ কথা বললাম, বোঝতে পারিনি। আসলে
ইফাকে সামনে দেখে আমি বাকহীন হয়ে গিয়েছিলাম ।
আপনার ভর্তির সাথে আমার না পড়ার কি রিলেশন? ইফা কথার পিঠে কথা বলেই গেলো, আমি কোন উত্তর দিতে পারলাম না। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম ইফাকে। ময়মনসিংহ চলে যাবার পর ইফার সাথে আমার দেখা সাক্ষাৎ প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। ছুটিতে এলেও খুব বেশী দেখা হয় না।
তাছাড়া পড়া লেখার চাপে আমার ব্রাহি ত্রাহি অবস্থা । উপায় নেই, ভালো আমাকে করতেই হবে। ইফার কথা ভূলে থাকলেও ভূলে যেতে পারি না। আমাদের বন্ধুদের অনেকেরই ব্যাচমেট , সিনিয়র জুনিয়র, এমন কি প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার থেকে শুরু করে প্রফেসরদের সাথেও ভাব বিনিময় হচ্ছে। কোথাও কোথাও নতুন প্রেমের গভীর উপাখ্যানও রচিত হচ্ছে। কেউ কেউ গভীর ভালোবাসার রাত কাটাতে একটু দূরেও চলে যাচ্ছে ।
নির্জনে, নিরিবিলি।
দু'একটা দমকা বাতাস যে আমার গায়েও লাগেনি এমন নয়। দুবছরের জুনিয়র আবিরাকে বহু কষ্টে অন্য পথ ধরিয়ে দিয়ে আমি নিজেকে বুঝিয়েছি, আমার তো ইফা আছে। হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করে আর ভাবে কেন ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেলাম না। কিন্তু আসলেই কি ভাবে? নাকি ভুলে গেছে আলোড়িত বিকেলের কথা কিংবা কোলাহলহীন দুপুরের কথা ।
ইফার শুভ্রতা আমার চোখের সামনে সাদা মেঘ হয়ে উড়তে থাকে । আমি পিছনে ছুটতে থাকি, একটু বৃষ্টি হলেই যেন ভিজতে পারি।
ইফা কি আমার কথা মনে রেখেছে? কেনই বা রাখবে? ওর সাথে তো আমার এমন কিছু হয়নি। কখনোতো বলিনি ভালোবাসি তোমায় ।
কোথাও ক্রিকেট খেলা দেখলে আনমনে দাড়িয়ে হারিয়ে যাই সেই চির চেনা সরু গলিতে । চেনাচেনা মুখ ৷ ভালো লাগার শিনিগ্ধ বাতাস । অপলক চেয়ে থাকি, এই বুঝি সাদা মেঘের মতন সামনে দিয়ে উড়ে যাবে ইফা।
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ফোন করি। কিন্তু ভয় করে। দিক্রি মানুষ কাটা বিদ্যা রপ্ত করছি, ছুরিতে শান দিয়ে লাশ কাটা ঘরে ঢুকি অথচ সাহস করে ফোন করতে পারি না।
এভাবে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় প্রফেশনাল হতে থাকে। আমি কৃতিত্বের সাথে উতরে যাই। মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে রহমান সাহেবের ছেলে ডাক্তার হচ্ছে। গর্বে বাবা মা'র বুক ভরে ওঠে । আমার এই ভালো রেজাল্ট নিতুর জন্য বকাবাজির কারণ হয়। বাবা মা সুযোগ পেলেই বলে, তুই তো তোর ভাইয়ের আংগুলের যোগ্যও হস নাই ।
একদিন এমবিবিএস পাস করে এসে একটা প্রাইভেট হাসপাতালে আইএমও হিসাবে জয়েন করি। বছরখানেক পর আমার জন্য পাত্রী দেখা শুরু হয় । আমি কোনটাতেই রাজি হই না। মা অবাক হয়। জানতে চায় আমার কোন পছন্দ অপছন্দ আছে নাকি। আমি এড়িয়ে গেলে নিতু মিটিমিটি হাসে । বুঝেও না বুঝার ভান করে মা আর এগোয়নি। কন্ডিশান দিলাম বিসিএস দিয়ে সরকারী ডাক্তার হয়ে বিয়ে করবো ।
মা বলে, কেন সরকারী ডাক্তার হতে হবে, আমার ছেলে কি ফেলনা নাকি, বলে আর হাসে । এ হাসি গর্বের, এ হাসি আনন্দের ৷ এতটুকু অহংকার নেই এ
হাসিতে
নিতু মজা করে বলে বুঝো নাই মা, তোমার ছেলে বিসিএস হয়ে পাত্র হিসাবে দাম বাড়াতে চায়। তাতেও পাত্রী দেখা বন্ধ হয়নি। হঠাৎ একদিন মা আমাকে নিয়ে কার বাসায় যাবে বলে বিকেলে বের হয়। আমি যেতে চাইনি। খুব জোর করে। নিতূটা মিটিমিটি হেসে বলে, যাও ভাইয়া, দেখলেই বিয়ে করতে হবে এমনতো কথা নাই। আবার ভালোওতো লাগতে পারে! ছেলেদের মন বলে কথা।
আমি কিছু বলার আগেই মা'ই উত্তর দেয়, আপনার তো দেখছি ছেলেদের
চন এ
হঠাৎ একদিন মা আমাকে নিয়ে কার বাসায় যাবে বলে বিকেলে বের হয়। আমি যেতে চাইনি খুব জোর করে। নিতুটা মিটিমিটি হেসে বলে, যাও ভাইয়া, দেখলেই বিয়ে করতে হবে এমনতো কথা নাই। আবার ভালোওতো লাগতে পারে! ছেলেদের মন বলে কথা।
আমি কিছু বলার আগেই মা'ই উত্তর দেয়, আপনার তো দেখছি ছেলেদের
মনের পোস্টমর্টেম করা শেষ!
মনের পোস্টমর্টেম করা শেষ!
তোমার ছেলের অবস্থা দেখছো মা, দেখেই বোঝা যায়, মনের কাটাছেড়া লাগে না, উপরে উপরে এমন ভাব যেন বিয়েতে কোন আগ্রহ নাই, আর মনে মনে পাগড়ি পরে রেডি । তোর ইচ্ছেটা সরাসরি মা'কে বললেই পারিস, এত বাহানার দরকার কি, হুম! বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই পেকে গেছিস, বলে আমি আমার রুমে যাই।
রাতে বাসায় ফিরে ভাবছি কিভাবে ইফার সাথে যোগাযোগ করা যায় । ল্যান্ডফোনে কল দিবো। নাম্বারতো আমার কাছে আছেই ৷ ও ফোন ধরবে তো? নাকি অন্য কেউ। আবার সেই পুরোনো ভয়। এমন দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে মা এসে আমার কাছে বসলো ।
'আর না করিস না বাবা, তোর অন্য কোন চিন্তা থাকলে বাদ দে, আমি ওদেরকে কথা দিয়ে দিনক্ষণ ঠিক করি।
আমি বলতে যাচ্ছিলাম এত তাড়াহুড়ো কিসের, মা তাতেই আমার সম্মতি ধরে নিয়ে খুশিখুশি মনে বেরিয়ে গেলো । দিন তারিখ ঠিক হলো ।
আমার হৃদয় তটে তখন অচেনা এক উত্তেজনার ঢেউ বারবার আছড়ে পড়ছে। ভাবনার অলিগলি গুলো কখনো অচেনা, কখনো দিনের আলোয় দেখা বহুচেনা হাইওয়ে ।
স্বপ্নের গাড়ীর স্টিয়ারিং চেপে ছুটে যাচ্ছি জীবনের লং ড্রাইভে ৷
কখনো দু'চোখ ঝলমল করে উঠছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে অজানা শঙ্কায়
বহু আনন্দোল্লাসে শুরু হলো দ্বিতীয় ইনিংস । আমার সেই সরু গলিটার কথা মনে পড়ছে। ব্যাট-বল-উইকেট ৷ কিপিং বলে চিৎকার ৷ ইফার হেঁটে যাওয়া ।
কাঁচা ফুলের মৌ মৌ সুবাসে পুরো রুমটা যেন একটা ছোট্ট বাগান । ছোট বোন নিতু এসে খোচা মেরে গেলো, অনেক রাত হয়েছে, দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়ো ৷ কথা বলার জন্য তো বহু সময় রয়ে গেছে।
পরে কিন্তু কথা ফুরিয়ে যাবে, সময় ফুরাবে না, বলে মিষ্টি করে হেসে দরজাটা টেনে দিয়ে চলে গেলো ।
তারপর কেটে গেলো বিশটি বছর ।
এখন আমাদের মেয়েটা বড় হয়েছে। মেডিকেলে পড়ছে। দেখতে একদম মায়ের মতন। মনে হয় সেদিনের কথা । বিকেলে আমরা বসে চা খাচ্ছি। হঠাৎ সোফার পাশে রাখা ল্যান্ডফোনটা একবার বেজেই কেটে যায়।
কলার আইডিটা অচেনা ।
আমি ইফার দিকে তাকাই । ও হেসে উঠে বলে, তোমার মতন পাগল এখনও আছে! ল্যান্ডফোনে মিস কল দেয়।
মেয়েটা এখনও ফেরে নি।
আমি ইফাকে ডান হাত দিয়ে পেঁচিয়ে বুকের কাছে নিয়ে আসি।
মনে হচ্ছে এই সেদিন । সরু গলি । সবাই ক্রিকেটে মত্ত । আমি ইফার হাত ধরে হাটছি। বহুদূরের পথ ৷ গু
মন্তব্য করুন
মন্তব্যটি পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হবে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি
এখনও কোনো প্রকাশিত মন্তব্য নেই।