মোতাহের হোসেন চৌধুরীর সংস্কৃতি-কথা ও সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক প্রবণতা: ঐতিহাসিক সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধান
মোঃ মোফাজ্জেল হোসেন
ঐতিহাসিক পটভূমি ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের দীক্ষা
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলমান সমাজের আত্মবিস্মৃতি , কুসংস্কার এবং ধর্মীয় গৌড়ামি দূর করে একটি আধুনিক, যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, ইতিহাসে তা 'বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন' নামে পরিচিত ৷ ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গঠিত “মুসলিম সাহিত্য-সমাজ' ছিল এই আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি , যার বার্ষিক মুখপত্র 'শিখা' (১৯২৭) পত্রিকারণপ্রথম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত থাকত অমোঘ বাণী: “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব” । এই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের অন্যতমপ্রধান রূপকার ছিলেন প্রবন্ধকার মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬)। তিনি আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ , কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল এবং আবদুল কাদিরের মতো মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথিকৃৎদের সহযোগী হিসেবে বাঙালি মুসলমানের মানসিক জড়তা ভাঙার সংগ্রামে অবতীর্ণ হন।
“সংস্কৃতি-কথা'র দার্শনিক কাঠামো ও মূল তত্ত্ব:
মোতাহের হোসেন চৌধুরীর মৃত্যুর পর ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃকপ্রকাশিত হয় তার বিখ্যাতপ্রবন্ধগ্রন্থ সংস্কৃতি-কথা'। এই গ্রন্থে মূলত মানবিক মূল্যবোধ , সৌন্দর্যচর্চা, প্রেম এবং আত্মিক উৎকর্ষের সমন্বয়ে একটি উন্নত জীবনবোধের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। গ্রন্থে সংকলিত “সংস্কৃতি-কথা”, “মূল্যবোধ ও যুক্তিবিচার”, “রিনেসীস: গোড়ার কথা ও আমাদের দৃষ্টিভংগ”, “ব্যর্থতা জিন্দাবাদ”, “দুঃখবাদ”, “সম্মান ও আত্মসম্মান”, “মেরুদন্ড” এবং “মনুষ্যত্ব” প্রবন্ধগুলোর মাধ্যমে তিনি মানবজীবনের সৌন্দর্য ও মননশীল বিকাশের এক অনন্য ডিসকোর্স নির্মাণ করেছেন। তার দৃষ্টিতে, মানুষের দুটি সত্তা রয়েছে-একটি তার জীবসত্তা এবং অপরটি তার মানবসতন্তা বা মনুষ্যত্ব। জীবসত্তারপ্রয়োজনে অনুবস্তরের চিন্তা করা অনিবার্য হলেও প্রকৃত মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত
সাংস্কৃতিক শুদ্ধতার মধ্য দিয়ে । র্ সংজ্ঞায়, সংস্কৃতি বা কালচার কোনো বাহ্যিক আচার বা জীকজমক নয়,
বরং তা হলো উন্নততর জীবন সম্বন্ধে গভীর সচেতনতা-সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্বন্বেপ্রতিনিয়ত অবহিতি ৷ সংস্কৃতিসাধনা মূলত “পাকা বা পাণ0ন8” হওয়ার সাধনা, যেখানেপ্রেজ্ঞা ও বিজ্ঞানের চেয়ে হৃদয়ের ভালোবাসার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি । সংস্কৃতি-কথা প্রবন্ধে তিনি বলেছেন,-
“কালচার মানে উন্নততর জীবন সম্বন্ধে চেতনা-সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্বন্ধে অবহিতি। সাধারণ লোকেরা ধর্মের মারফতেই তা পেয়ে থাকে। তাই তাদের ধর্ম থেকে বঞ্চিত করা আর কালচার থেকে বঞ্চিত করা এক কথা ।”
হস্কৃতিরপ্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও ব্যক্তিতান্ত্রিক। সমাজ সাধারণত মানুষকে গড়পড়তা বা “প্রমাণ-সাইজ” করে রাখতে চায় এবং সমতা বজায় রাখতে গিয়ে ব্যক্তির অনন্যতাকে নষ্ট করে। সমাজের নির্দেশ হলো “দশের মধ্যে এক হও, এগারো হয়ো না”, কিন্তু সংস্কৃতির চিরন্তন আহ্বান হলো “দশের মধ্যে এগারো হও”। সংস্কৃতিবান মানুষ সামাজিক অনুশাসন বা অর্থনৈতিকপ্রতিকূলতার দোহাই দিয়ে নিজের অসৌন্দর্যকেপ্রশ্রয় দেয় না, বরং নিজের রুচিবোধকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। হস্কৃতিসাধনার অন্যতম ভিত্তি হলো পরমতসহিষ্ণুতা ও বহুভগম জীবনদর্শন। মতবাদীদের সংকীর্ণ একত্ববাদের বিপরীতে একজন্প্রকৃত সংস্কৃতিকামী বিশ্বাস করেন “[8[ 08 81188 [0 0” তত্ত্বে। মানুষের মনোজগৎকে তিনি একতারার বদলে বহু সুরের সিক্ষনি বা বহুতার জীবনবীণার সাথে তুলনা করেছেন। সংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো নীরবতা ও গ্রহণশীলতা । তার মতে, “কান পাতাতেই ₹স্কৃতি, মুখ খোলাতে নয়”-অর্থাৎ অন্যের বিচিত্র ভাব ও অনুভূতিকে নিজের অন্তরে ধারণ করার মাধ্যমেই সংস্কৃতিরপ্রকৃত উন্মেষ ঘটে । এই দর্শনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হলো নিজের ভেতরে এক অনন্য মানবিক আদর্শ তথা নিজের “ঈশ্বর” সৃষ্টি করা । জর্জ বার্নার্ড শ-এর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন যে, “88৪ 078 181 0088 8018 8 9085”- অর্থাৎ যার ঈশ্বর কেবল আকাশে বা বাহ্যিক উপাসনালয়ে সীমাবদ্ধ , তার দ্বারা যেকোনো অন্যায় বা নিষ্ঠুর কাজ সম্ভব, কারণ সে ধর্মকে জীবনপ্রেরণা হিসেবে না পেয়ে কেবল ঠোটের বুলি হিসেবে গ্রহণ করেছে। ধর্ম বনাম সংস্কৃতি: মোতাহের হোসেন চৌধুরী ধর্ম এবং সং তির মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত পার্থক্যের এক নিভীক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। তার মতে, ধর্ম ওতিংত মানুষের মনের দু'টি ভিন্ন স্তরেরপ্রতিনিধিত্ব করে। যেখানে সাধারণ মানুষ ধর্মের মাধ্যমে জীবনের নৈতিক নির্দেশনা খোজে , সেখানে . মার্জিত ও আলোক্প্রাপ্ত মানুষ সংস্কৃতির ভেতরের সৃূক্ষমচেতনার মাধ্যমে নিজেকে চালিত করে।
আভিজাত্য, পুঁজিবাদীপ্রভাব ও ভাবনার সীমাবদ্ধতা:
মোতাহের হোসেন চৌধুরীরপ্রগতিশীল চিন্তাধারা সত্ত্বেও সমকালীন সমাজবিজ্ঞানী ও সমালোচকদের দৃষ্টিতে তার দর্শনে কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার রচনায় ইউরোপীয় ধনতান্ত্রিক সভ্যতারপ্রত্যক্ষপ্রভাব লক্ষ্য করা যায়, যা অনেক সময় তাকে সমকালীন রূঢ় সামাজিক বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল। তিনি সমষ্টিগত অর্থনৈতিক মুক্তি বা শ্রেণীহীন সমাজ গঠনের বিপ্লবী সংগ্রামকে তার সাংস্কৃতিক এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত করেননি। ফরাসি লেখক আদরে
মারোয়ার (১৮৮৫-১৯৬৭) ভাবাদর্শ অনুসরণ করে তিনি সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদকে ব্যক্তির স্বাধীন বিকাশের ক্ষেত্রে একটি অন্তরায় হিসেবে গণ্য করেছেন । এর ফলে তার সাংস্কৃতিক ধারণাটি এক ধরনের আভিজাত্য বা এলিটবাদের (ম|্যা) দোষে দুষ্ট হয়ে পড়ে৷ তিনি যখন ঘোষণা করেন যে , “ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম”, তখন তিনি অজান্তেই সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের লোকসংস্কৃতি ও তাদের দৈনন্দিন লড়াইকে মূল সাংস্কৃতিক ডিসকোর্স থেকে খারিজ করে দেন। সমকালীন ভারতবর্ষে চলমান গঁপনিবেশিকতাবিরোধী তীব আন্দোলন, দেশভাগ বা দাংগার মতো বিশাল রাজনৈতিক রূপান্তরগুলো তার তাত্ত্বিক রচনায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল ৷ তিনি মূলত সমাজ-বাস্তবতার রুক্ষ মাটি স্পর্শ না করে নান্দনিকতা ও শুদ্ধ মানবিকতাবাদের এক বিমূর্ত স্বর্গে নিজের চিন্তাকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন । সমকালীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রূপান্তর ও অবক্ষয়: মোতাহের হোসেন চৌধুরী তার জীবদ্দশায় যে পরিশীলিত ও মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন বাঙালি হ্কৃতির স্বপ্ন দেখেছিলেন, সমকালীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় তার এক চরম বিপরীতমুখী রূপান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গ্রামীণ ও নগর সংস্কৃতির চিরাচরিত বৈচিত্র্য ক্ষুন্ন হয়ে সমাজ এখন এক করাল অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে৷ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও তরুণ্প্রজন্মের সাংস্কৃতিক গতিপ্রকৃতিতে কয়েকটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবসক্ষয়মূলকপ্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও মনত্ভাত্ত্বিক কলোনিয়ালতা: তথ্যপ্রযুক্তির অবাধপ্রসারের যুগে দেশীয় সুস্থ সংস্কৃতি আজ গভীর হুমকির সম্মুখীন ৷ বিশেষ করে সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বাংলা স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর মেগা সিরিয়াল বাংলার ঘরে ঘরে মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসন চালাচ্ছে । এইসব সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সিরিয়ালের কন্টেন্টগুলোর অবাস্তব ও চটকদার জীবনযাত্রারপ্রতি নারী-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের তীর আসক্তি পারিবারিক ভাঙন ও সামাজিক অসহিষ্চুতা সৃষ্টি করছে যা সমাজতাত্ত্তিক অবক্ষয়ের চরম নিদর্শন। এই সাংস্কৃতিক দাসত্ু তরুণদের নিজস্ব এঁতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে সংস্কৃতির পণ্যকরণ ও বাহ্যিকতা: আজকের বাঙালি সমাজে সংস্কৃতির মূল উপাদান যেমন-সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও ভাষার চর্চপ্রায় নির্বাসিত ৷ সংস্কৃতি এখন কেবল “বিক্রির জিনিস' বা প্রদর্শনের পণ্যে পরিণত হয়েছে৷ পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা পোশাক পরিধান কিংবা পান্তা-ইলিশ খেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি পোস্ট করার মধ্যেই আজ বাঙালিয়ানা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে । তরুণদের ভাষা ব্যবহারে বিদেশি শব্দ বা স্লাং-এর হ্ড়াছড় এবং ইংরেজি বা হিন্দি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ গভীর শিকড়হীনতারপ্রমাণ চ্ছে। প্রযুক্তিগত অপব্যবহার ও নৈতিক স্থলন: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ যেখানে যুক্তিবাদী মননশীলতা বাড়াতে পারত, সেখানে তার অপব্যবহার তরুণ প্রজন্মকে ধ্বথ্গের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কপিক্যাট ট্রেন্ড, টিকটক আসক্তি, অনলাইন ক্যাসিনো , কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপতথ্য এবং সাইবার অপরাধের গোলকথধাধায় কিশোর ও তরুণরা আজ দিশেহারা । বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পুঁজিবাদী কর্পোরেট মুনাফার লোভেই সারা বিশ্বে এই নতুন বিকৃত সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তির করাল গ্রাসে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে কিশোর গ্যাং-এর সহিংসতা, হত্যা, ধর্ষণ, চাদাবাজি এবং যৌন হয়রানির মতো জঘন্য অপরাধসমূহ ।
অর্থচিন্তা ও “ছোটলোকপনা সাধনা”:
মোতাহের হোসেন চৌধুরী আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ধনী-দরিদ্ব নির্বিশেষে সকলে আজ “অর্থচিন্তার নিগড়ে বন্দি”. বর্তমান বাংলাদেশে জীবন-সাধনার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাড়িয়েছে অনৈতিক উপায়ে অর্থ এবং সম্পদ সঞ্চয় করা, যাপ্রাবন্ধিকের ভাষায় “ছোটলোকপনার সাধনা” টাকা পয়সা কামানোর এই অশ্বপ্রতিযোগিতায় নীতি ও মূল্যবোধ আজ নির্বাসিত, যার ফলে সামগ্রিক সমাজ কাঠামোটি এক গভীর নৈতিক শূন্যতায় পতিত হয়েছে।
শিক্ষা, দক্ষতা ও মানবসম্পদ সংকটের চিত্র:
বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ কেবল ডিগ্রি ও সার্টিফিকেটপ্রদানের এক নিষ্ফলা কারখানায় পরিণত হয়েছে। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর মতে, শিক্ষার আসল কাজ কেবল জ্ঞান বা তথ্য পরিবেশন নয়, বরং মানুষের অন্তরে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় মানবিক উৎকর্ষের অভাব এবং বাস্তবমুখী দক্ষতার অনুপস্থিতি তরুণপ্রজন্মূকে এক চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাড় করিয়েছে।
“সংস্কৃতি-কথা'র আলোকে সমকালীন সংকটের ব্যবচ্ছেদ ও উত্তরণ:
মোতাহের হোসেন চৌধুরীর তত্ত্বের আলোকেই বর্তমান বাংলাদেশের তরুণপ্রজন্যের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়ের গভীর ব্যবচ্ছেদ করা সম্ভব । বর্তমান যুগে তরুণদের মাঝে যে ভয়াবহ ডিপ্রেশন ও আত্মহননেরপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তারপ্রধান কারণ হলো তাদের জীবনচর্চায় অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য ও প্রেমের মতো সুকুমার বৃত্তিগুলোর অনুপস্থিতি ।
আজি
তরুণরা যাতে দেশে থেকেই স্বাধীনভাবে তাদের চিন্তা ওপতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে, তার জন্য দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দুর্নীতিমুক্ত কর্মসংস্থান ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যাতে ক্ষতিকারক মেধাপাচার রোধ করা যায়... এই চরম সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হলে বাঙালি সমাজকে আবারও "বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন' এবং মোতাহের হোসেন চৌধুরীর
জীবনাদর্শের কাছে ফিরে যেতে হবে...
সমাজ আজ তরুণদের কেবল 'স্ষুর্বপপাসার' বা বৈষয়িকপ্রাপ্তির জগৎ নির্মাণের তাগিদ দিচ্ছে, কিন্তু ক্ষুধা নিবারণের উর্ধ্বে যে আরেকটি আনন্দের ও মহত্তবের জগৎ রয়েছে, সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা দিচ্ছে না। অনুবস্তরের সুব্যবস্থা অবশ্যই জীবনের জন্যপ্রয়োজনীয় , কিন্তু তা যদি মূল্যবোধহীন লোভের জন্ম দেয়, তবে শিক্ষা কখনও মানুষের জীবনে সোনা ফলাতে পারে না।
বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, যা এক ইতিবাচক অর্থনৈতিক রূপান্তরের সূচনা করতে পারে৷ কিন্তুপ্রয়োজনীয়প্রাথমিক পুঁজি , ব্যাংক খণের জটিলতা প্রযুক্তির অবকাঠামোগত অসমতা এবং পারিবারিক ও সামাজিক সমর্থনের অভাবে এই তরুণ উদ্যোক্তাদের অশগ্রযাত্রাপ্রায়শই ব্যাহত হচ্ছে। কেবলপ্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা পুঁজি নয়, মোতাহের হোসেন চৌধুরীর দর্শনে একজন উদ্যোক্তা বা সংস্কু তিবান মানুষকে হতে হবে গভীর মানবিক গুণসম্পন্ন , যিনি কেবল নিজের সাফল্যের কথাই ভাববেন না, বরং সমাজের অন্যান্য মানুষের কল্যাণ সাধনেওপ্রতিশুতিবদ্ধ থাকবেন।
এই চরম সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হলে বাঙালি সমাজকে আবারও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন' এবং মোতাহের হোসেন চৌধুরীর জীবনাদর্শের কাছে ফিরে যেতে হবে। তরুণদের এই চোরাবালি থেকে রক্ষা করতে হলে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে মনোযোগ দেওয়া আবশ্যক:
ক. শিক্ষার লক্ষ্য পরিবর্তন: শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল মুখস্থনির্ভর জিপিএ অর্জনের বৃত্ত থেকে বের করে সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ, সৃজনশীল চিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টির পদ্ধতি হিসেবে রূপান্তর করতে হবে।
খ. সাংস্কৃতিক বিকেন্দ্রীকরণ ও সামাজিকীকরণ্রতিটি পাড়া-মহল্লায় পাঠাগার বা লাইবেরি স্থাপন করতে হবে। কারণ লাইব্নেরি হলো মানবসভ্যতার অর্জিত জ্ঞানের সঞ্চয়শালা এবং একটি জাতির অগ্রগতির মূল মাপকাঠি ৷ একই সঙ্গে খেলাধুলা ও গঠনমূলক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বাড়িয়ে তরুণদের ডিভাইস ও মাদকের আসক্তি থেকে মুক্ত করতে হবে।
গ. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও পরিবেশ সৃষ্টি: তরুণরা যাতে দেশে থেকেই স্বাধীনভাবে তাদের চিন্তা ওপ্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে, তার জন্য দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দুর্নীতিমুক্ত কর্মসংস্থান ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যাতে ক্ষতিকারক মেধাপাচার রোধ করা যায়।
ঘ. দেশীয় সংস্কৃতির আধুনিক রূপান্তর: ভারতীয় সিরিয়াল বা বিদেশি চটকদার অপসংস্কৃতির ক্ষতিকরপ্রভাব থেকে সমাজকে বাচাতে হলে আমাদের নিজস্ব সমৃদ্ধ সাহিত্য ও লোকএতিহ্যকে আধুনিক তরুণপ্রজন্যের রুচির উপযোগী করে মিডিয়ার মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বাহ্যিক চাকচিক্যময় সভ্যতা তৈরি করা সহজ, কিন্তু একটি সংস্কু তিবান মানবিক সমাজ গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন সাধনা ৷ মোতাহের হোসেন চৌধুরীর 'সংস্কৃতি-কথা'র মূল নির্যাস ধারণ করে যদি আমরাপ্রতিটি তরুণের অন্তরের সূক্ষনচেতনা ও আত্মিক দেবতাকে জাগ্রত করতে পারি, তবেই কেবল সমকালীন অবক্ষয়ের বিষাক্ত বৃত্ত ভেঙে একটি সুন্দর, মহৎ ওপ্রগতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব৷
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, যশোর সরকারি মহিলা কলেজ, যশোর । *
মন্তব্য করুন
মন্তব্যটি পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হবে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি
এখনও কোনো প্রকাশিত মন্তব্য নেই।