অসিদ্ধ প্রেমের মরম
ফারাহ জেহির
প্রথম যেদিন আমাদের দেখা হয়, হৃদয়ের ভিতর ধুকপুক ধুকপুক শব্দ আর উত্তেজনা নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে দেখছিলাম দুজন দুজনকে। আর সেই দেখার রেশ ধরে কতদূর পথ চলে এসেছি এক পা দু পা করে বলতে পারব না। সময়কে না পারলেও অন্য সবকিছুকে কোথায় যেন স্থির করে নতুন জীবনকে স্বাগতম।
ব্যস্ততার কারণে উত্তর দেওয়া তোমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠতো না সেটা আমি বুঝতে পারি। তাই আমি মনে মনে তোমার উত্তরগুলো পড়ে নেই। তোমাকে নিয়মিত চিঠি লেখা আর স্ব-কথোপকথন...তোমার উপস্থিতি অনুভব করার জন্য যথেষ্ট । তুমি আবার একে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ বলে মনে করোনা যেন দেখো ৷ হ্যাঁ, তবে স্ব-কথন বলতে পারো যা আমি লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করি। সে যাই হোক, তুমি বুঝতে পারলেই হলো ।
মনে আছে তোমার, সময়কে স্থির করে রাখা যায় নিয়ে কতই না কাব্য ও গল্পে পড়েছি। কিন্তু সত্যি কি তাকে স্থির করে রাখা যায় ? সময় স্মৃতি হয়ে কারণে-অকারণে মনের ভিতর বিচরণ করতে থাকে৷ কেনো জানি আজকে তোমাকে খুব মনে পড়ছে। আজ মনে হচ্ছে স্মৃতির গল্পগুচ্ছ হাতে নিয়ে সময়টাকে একটু স্থির করে রাখি আর পুরোনো অনুভূতি গুলোকে আবার করে ফিরিয়ে আনি।
কথোপকথনের ধরনটা তোমার বরাবরই একটু ভিন্ন ছিলো। অনেক সময় কিছুই না বলে অনেক কিছুই বুঝিয়ে দিতে আবার কিছু কিছু সময় এতটাই বলতে যে মগজ পর্যন্ত ঢুকে যেতো । আমি ঠিক তার বিপরীত ছিলাম, মনের ভাব সব লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতাম । লিখতে পারলে আমার ভালো লাগতো কারণ এই সব কথা আমি তোমার সামনে তো কোনোদিন বলতেই পারিনি।
মনে আছে তোমার, প্রথম যেদিন আমাদের দেখা হয়, হৃদয়ের ভিতর ধুকপুক ধুকপুক শব্দ আর উত্তেজনা নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে দেখছিলাম দুইজন দুইজনকে । আর সেই দেখার রেশ ধরে কতদূর পথ চলে এসেছি এক পা দু পা করে বলতে পারবোনা ৷ সময়কে না পারলেও অন্য সবকিছুকে কোথায় যেন স্থির করে নতুন জীবনকে স্বাগতম জানিয়েছিলাম এক গাঢ় ধূসর রঙের আবরণে । সেই আবরণে আজও আলষ্টেপিষ্টে রয়েছে আমাদের ভালোবাসা, মুহূর্ত, মুগ্ধতা, খুনসুটি প্রেম, মান-অভিমান আর ক্ষ্যাপা ইচ্ছা ।
রংধনু প্রায়ই সময় আমাদের আকাশে খুব কম সময়ের জন্য দেখা দিতো কিন্তু যখনই দেখা দিতো আমি চট করে তার থেকে কিছু কিছু রং চুরি করে নিতাম ধূসর আবরণে ভালোবাসার লেবাস বুননের জন্য। যখন ইচ্ছা আমরা সেই আবরণ ধারণ করতাম আবার খুলেও রাখতাম, হয়তো বা সেটাই একটা মাধ্যম ছিলো যার দ্বারা আমরা একে অন্যকে এতটা বুঝতাম।
লব
তোমার আমার ভাসানো নৌকা স্রোতের বিপরীতে ভিন্ন পথে পাল তুলেছিলো ৷ কিন্তু হাওয়া বদলে নৌকার দিক নির্দেশনা ঘুরে একই গন্তব্যস্থলে এসে ভিড়লো ৷ তবে এই যাত্রায় ঝড়ের মোকাবেলায় আমাদের কোনো তুলনা নেই , সেই যে শক্ত হাতে পালের রশি ধরেছিলাম আজও তার টানে পালের দিশা ঠিক পথটাই বেছে নিয়েছে। তবে একটা কথা বলতেই হবে যে, সাহস ছিলো আমাদের ডাকাতের মতো তাই মহার্ণবে নৌকা ভাসিয়েছি আমরা যেখানে ইঞ্জিন চালিত জাহাজ চলার কথা । এ যে ক্ষ্যাপা ইচ্ছা ,মাঝে মাঝে মনে হয় কাব্য গুলো লেখার সময় কি এতকিছু জানা ছিলো-
“সেই পথ না তোমার জানা, না আমার দেখা,
তবুও অচিন ব্যথার কালিতে একই ঠিকানা লেখা, হাত বাড়ালে আমার তরে শত ভিড়ের মাঝে
আমিও কি ভেবেছিলাম অবেলার এই সাঝে, সেদিনও ছিল বৃষ্টি তবু তাপ দাহনে অপারগ,
শীতল মনের উষ্ণ ক্ষোভে দুটি হৃদয়ে ক্ষ্যাপা রোগ ।”
অলিখিত অধিকারের জাদুর ছড়ি নিয়ে আমরা বেশ একে অন্যের উপর রাজ করতাম। আর সেটা যখন নিশ্বাস অবধি আসতো তখন আর কে পায় আমাদের , রাগে থার্মোমিটার ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে যাওয়ার অবস্থায় এসে দীড়াতো । তবে ভালো লাগতো জানো, কারণ মনে হতো অধিকার তো আছে রাগ হওয়ার । আবার মনে অনেক কষ্টও লাগতো । ইন্দ্রিয় আর নফস এর কলহে মনে হতো যে, সত্যি কি এদের কোনো প্রয়োজন আছে আমাদের জীবনে ?
আর দশটা রক্ত মাংসের মানুষের মতো আমরাও স্বাভাবিক আচরণ করতাম। যদিও স্বাভাবিকতা আমাদের কাছে অনেক উচ্চ মানের একটা ব্যাপার ছিলো । যা অন্যদের কাছে অস্বাভাবিক তা আমাদের কাছে অনেক স্বাভাবিক ছিলো অধিকারের বলবৎ এ অসাধ্য সাধন করেছি আমরা ৷ জীবনকে অনেক কিছু দেওয়ার ছিলো এবং তার থেকে শেখারও ছিলো । আমরা সব মিলেনিশে করেছি এবং শিখেছি। আর জীবন আমাদের থেকে যা নিয়ে গেছে তার ভর্তুকি সে নিজেও দিতে ব্যর্থ ।
একটা সম্পর্কে ব্যর্থতা অনেক কষ্টদায়ক । যার ভার বহন তো করতেই হয় সাথে সাথে জবাবদিহিও পিছু ছাড়েনা। তবে এক মুহূর্তের জন্য তুমি আমার হাত ছাড়োনি। হাত ধরে রাখার এই শক্তি আমার কানে কানে বলে গেছে বারবার- সুড়ংেগের অপর প্রান্তে আলো আছে... তুমি থেমো না যেনো । সারাক্ষন আমার কানে এই কথাগুলো তুমি বলে যাও। কিন্তু তোমাকে দেখিনা আজ কতো দিন হয়ে গেছে। এক একটা দিন যেন মাসের মতো করে পার হচ্ছে । তোমাকে মনে করার মতো আমার কাছে তোমার রেখে যাওয়া কাপড়ে গায়ের খুশবু , আবছায়া দৃষ্টিতে তোমার মুখের হাসি, তোমার চোখে চোখে কথা বলার মুগ্ধতা, বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের একজন সৃজনশীল , সুশৃঙ্খল, পদ্ধতিগত এবং দুঃসাহসিক প্রেমিক এর ছবি আছে। সংসারের অলিক মায়াজালে বন্দী তো হতে চেয়েছিলাম আমরা, কিন্তু দেখো সেই স্বপ্ন আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।
এক একটা খতু এক একটা স্মৃতির পাতা উলটিয়ে যাচ্ছে, আর আমি প্রতিদিন তাদেরকে একটু একটু করে পড়ছি। ওরা গল্প বলে আর আমি চুপ করে শুনি । এখন
আমার মৌনতায় কারো কিছু যায় আসে না । আগে তো আমি চুপ করে থাকলে তুমি অস্থির হয়ে পড়তে । ছোটবেলায় ক্লাসে অতিরিক্ত কথা বলার জন্য কত শাস্তি খেয়েছিলাম । বড় বেলায় মা বলতো, কি এত বকর বকর করো ? আর এখন নিজেকে দেখলে অনেক অবাক লাগে, যে সত্যি এটা কি আমি! চুপচাপ সবার কথা শুনছি। এখানেও সময় সব কিছু করিয়ে নিচ্ছে আমাদেরকে দিয়ে আর আমরাও ঘড়ির কাটার সাথে সাথে চলছি আর কাল করে যাচ্ছি।
আমার মনে হয় সময় আমাদের উপর অনেক রাগ তাইনা, অনেক অবহেলা করেছি তাই তো এখন সে গুনে গুনে প্রতিশোধ নিচ্ছে । এক এক সময় মনে হয় কিছু কিছু মুহূর্ত যদি মুছে দিতে পারতাম তাহলে হয়তো সে একটু সদয় হতো আমাদের প্রতি । তবে যাই বলো সময়ের সৎ ব্যবহার কিভাবে করতে হয় তা তোমার থেকে শেখা উচিত। এই ভরসায় তোমার কদমে কদম মিলিয়ে আজ আমি এতদূর এসেছি।
ও তোমাকে তো বলাই হয়নি , গতকাল স্বপ্নে দেখি আমি তোমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজে
ভিজে সিনেমার নায়িকাদের মতো আচল উড়িয়ে গান করছি। কি দুর্দান্ত স্বপ্ন বলো তো ।
সত্যি বলতে কি আমার অনেক ইচ্ছা ছিলো তোমার সাথে এমন একটা মুহূর্ত কাটাতে, হসুটে সময় আর কই দিলো ।
আচ্ছা আজকে আমার এতটুকুই মনে পড়েছে যার সব তোমাকে জানালাম। এর থেকে বেশি লিখলে তুমি পড়তে পড়তে হয়রান হয়ে যাবে । সময় করে পড়ে দেখো তোমারও মনে হবে একবার সময়ের ম্যাজিক কার্পেট এ যদি চড়া যেতো
“সময় যদি থমকে যেতো তোমার আমার গল্প যতো মেলতো সুখের ডানা, উপন্যাসের পাতায় তোমার রইতো হাতের ছোয়া ।” ইতি
তোমার বিনি।
বিনির গয়না গাটির প্রতি তেমন কোনো আকর্ষণ ছিলো না কিন্তু তার একটা সুন্দর গয়নার বাক্স ছিলো যেখানে বিনি তমালকে লেখা চিঠি গুলো সমযত্লে গুছিয়ে রাখতো। বছরে আমার সাথে বিনির দেখা হতো চার কি পাচবার। আমি জানতাম প্রতি সপ্তাহে বিনি তমাল কে চিঠি লিখতো গল্পাকারে আর আমি সেগুলো কালেক্ট করার জন্য যাই যাতে করে প্রকাশকের কাছে পৌছে দিতে পারি। বিনির সময় থেমে গেছে আজ থেকে সাত বছর আগে । তমালের সাথে বিনির শেষ দেখা হয়েছিলো এয়ারপোর্টে । এরপর বিনি নিজেও জানেনা তমাল এখন কোথায় আছে, কেমন আছে, কিংবা আদৌ বেঁচে আছে কিনা । সাত বছরের আগের সব কথা
মনে আছে বিনির কিন্তু [
এরপরে সে আর মনে
করতে পারেনা । তমাল যখন কাজের জন্য ফ্রাঙ্সে গেলো তখনও
তাদের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ ছিলো। এক মাস পর কোনো একটা বিষয় নিয়ে ওদের মধ্যে মনোমালিন্য হয় আর এর থেকে তা গাড়িয়ে গিয়ে অভিমানের অথৈ সাগরে যেয়ে পড়ে। বিনি আর তমালের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করার সুবাদে তাদের চারিত্রিক কিছু গুনাগুনের সাথে আমি ওয়াকিবহাল _ ছিলাম। প্রচন্ড অভিমানী ও রাগী, দুই ব্যক্তিত্বের মানুষ তারা। আর এই রাগ ও
আজি
এক বছর পর থেকে তমালের সাথে যোগাযোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর বিনি মনে হয় কান্নার সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে কোনো রকমে তীরে এসে পৌছালো কিন্তু সাথে করে নিয়ে আসলো স্ব-কথন ও ভিত্ব্য়াল হ্যালুসিনেশন যাকে মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় সিজোফ্রেনিয়া বলে... সৌভাগ্যবশত বিনি অতীতের সব কিছু মনে আছে তাই সে স্ব-কথন আওড়াতে
থাকে আর লিখতে থাকে
অভিমান তাদের জন্য কাল হয়ে এসেছিলো ৷ যোগাযোগ এক পর্যায়ে সুপ্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিনত হলো । যে যার দায়িত্ব পালন করে গেলো ।
এক বছর পর থেকে তমালের সাথে যোগাযোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর বিনি মনে হয় কান্নার সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে কোনো রকমে তীরে এসে পৌছালো কিন্তু সাথে করে নিয়ে আসলো স্ব-কথন ও ভিজ্ব্যয়াল হ্যালুসিনেশন যাকে মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় সিজোফ্রেনিয়া বলে। স্ব-কথোপকথনে জড়িত থাকলেও বিনির চিন্তাভাবনা আর শ্রবন শক্তির উপর এই রোগ তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। এতে করে সুবিধা হয়েছে যে সে ইন্সট্রাকশন ফলো করতে পারে। যেহেতু বিনি হাতে লিখতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে তাই ডাক্তার তাকে আগের যা যা মনে আছে তাই লিখতে বোলতো ৷ বিনি লিখতেও পারতো বাবা, দিস্তা দিস্তা লিখে যেতো ।
সৌভাগ্যবশত বিনি অতীতের সব কিছু মনে আছে তাই সে স্ব-কথন আওড়াতে থাকে আর লিখতে থাকে । তিন চার মাস যেতে না যেতে একদিন সে আমাকে দেখে বলল ,
-সিনজন জানো, তমাল জানতো আমি চিঠি লিখতে অনেক ভলোবাসি তাই আমি ওকে চিঠি লিখি । কারণ ও তো অনেক ব্যস্ত আর দেখোনা রাগ করে মুখ ফুলিয়ে রেখেছে, চিঠি গুলো ধীরে ধীরে ওর কাছে পৌছাবে আর আমার হাতের লেখা দেখে খুশিও হবে।
-হ্যা তো, বেশ ভালো আইডিয়া ৷ তুমি লিখে রাখো আমি একসাথে পোষ্ট করে দেবো ।
সেই সময়কার হট, বোল্ড, স্মার্ট , স্পষ্টভাষী , সুন্দরী একজন লেখিকার সময় এখন গয়নার বাক্সে রাখা চিঠির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেলো বলা ভুল হবে কারণ একদিন একটা ফোন কল আসলো ,
হ্যালো, জ্বী বলেন
-সিনজন বলছেন
-জ্বী বলছি
-বিনয়া আলী যে লেখা গুলো লিখছেন, আপনাকে একটা ঠিকানা দিচ্ছি সেখানে প্রত্যেক তিনমাস পরপর পোস্ট করবেন । আর প্লিজ একটা অনুরোধ-এটা শুধু আপনার মধ্যে রেখেন।
-হ্যা জ্বী, রাখবো। একটু একটু শোনেন, আপনি কে বলছেন
আমি আ..আ.. মি কলম প্রকাশনি থেকে বলছি।
বিনির লেখা নিয়মিত প্রকাশ পাচ্ছে কলম প্রকাশনি থেকে ৷ কে, কেনো , কিভাবে জানলো বিনি লিখছে, কি সম্পর্ক বিনির সাথে তার ইত্যাদি নিয়ে আমি আর মাথা ঘামায়নি ৷ কিছু কিছু সম্পর্ক এমনই গায়েবি রয়ে যায় যাদের নামকরনের প্রয়োজন হয়না । আর আমারও মনে হয়না তার খোজ করা উচিত হবে..
মন্তব্য করুন
মন্তব্যটি পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হবে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি
এখনও কোনো প্রকাশিত মন্তব্য নেই।