প্যারিসের ছাগল ও বাঁধাকপির ঠেক
আজ সকালের পুরোটাই আমার কেটেছে ম্যানুয়েল নামের আমেরিকার এক হিস্পানিক তরুণের সঙ্গে। আমার মতো ম্যানুয়েলও প্যারিসের রকমারি আর্ট অবজেক্টে সজ্জিত একটি হোটেলে বাস করছে। মাস ছয়েক আগে ম্যানুয়েল মিসাইল ছোড়ার গানার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নেভির একটি নিউক্লিয়ার সমরাস্ত্র-বাহী সাবমেরিনে কর্মরত ছিল। কোনো কারণে চাকরিচ্যুত হয়ে সে প্যারিসে ঘুরে বেড়িয়ে সময় কাটাচ্ছে। আজ সকালবেলা আমি তার সঙ্গে নগরীর সাঁজেলিজে নামের একটি সরণিতে বাস্তিল-ডে পালনের উৎসব দেখতে গিয়েছিলাম। ওখানে ম্যানুয়েল আমাকে আগাথা নামে এক গ্রিক নারীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বুঝতে পারি, আগাথার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব জমে উঠছে। বাস্তিল ডে-র অনুষ্ঠান শেষ হতেই আগাথা তার চেনা একটি রেস্তোরাঁয় লাঞ্চে যেতে চায়। সে ম্যানুয়েলের সঙ্গে আমাকেও মধ্যাহ্নভোজে যোগ দিতে আন্তরিকভাবে অনুরোধ করে।
সাঁজেলিজে থেকে বেরিয়ে হেঁটে দুটি ব্লক অতিক্রম করে আমরা পা দিই পথচারীদের চলাচলে প্রাণবন্ত একটি স্ট্রিটে। প্রশস্ত এ রাজপথে গাড়িঘোড়া কিছু নেই। পায়ে হেঁটে চলছে পর্যটকরা। কেউ কেউ ঘরঘরিয়ে রোলার স্কেট বা স্কেটবোর্ড হাঁকাচ্ছে। হেলমেট মাথায় শর্টস পরা একটি মেয়ে বাইসিকেলে প্যাডেল করতে করতে অবাক হয়ে আমাদের অবলোকন করে। আমরা ঢুকে পড়ি একটি গলিতে। এদিকে দোকানপাট প্রচুর। আমাদের পাশ কাটিয়ে হেঁটে যায় শপিং ব্যাগ হাতে হাসিখুশি চৌকস চেহারার দুই তরুণী। যেতে যেতে ‘লা আমোর ডে ফ্লোর’ নামে একটি ফুলের দোকানে চোখ পড়ে। ইচ্ছা হয়, ওখানে ঢুকে আগাথার জন্য এক গুচ্ছ শিশিরস্নাত চন্দ্রমল্লিকা কিনে দিই। কিন্তু ব্যাপারটি হয়তো ম্যানুয়েলের পছন্দ হবে না, তাই ইচ্ছেটা চেপে নীরবে পা বাড়াই।

মনে হয় আগাথা এ এলাকার পথঘাট ভালো চেনে। সে আমাদের নিয়ে ঢুকে পড়ে সম্পূর্ণ নির্জন একটি সড়কে। পথের দু-পাশে বিশাল আবাসিক ইমারতগুলোর জানালায় লাগানো কাঠের শাটার। প্রতিটি ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর নকশা ও রং আলাদা। প্রতিটি বাড়ির সামনে টবে টবে প্রচুর ফুল; মনে হয়, জানালার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে টবগুলো রাঙানো হয়েছে। সড়কের ঠিক মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে অলস ভঙ্গিতে লেজ নাড়ছে দুটি ছানাসহ একটি লোমশ বিড়ালি। কিছু কিছু বাড়ির দেওয়ালে নানা রকমের ছবি আঁকা। একটি ছবিতে তিন-তিনটি উটপাখি দেখে আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। উটপাখির পিঠে সওয়ার একজন মানুষ ছবিটিকে রূপকথার কল্পজগতে নিয়ে গেছে। সিয়েরা লিওনে আমার আপাত নিঃসঙ্গ জীবনে আমি মাঝে মাঝে এক লেবানিজ নারীর সঙ্গে ক্যাফে কিংবা পানশালায় বসতে ভালোবাসি। নানা দেশের বিচিত্র স্ট্রিট আর্ট সংগ্রহ করতে সে পছন্দ করে। তার কথা ভাবতে ভাবতে আমি মোবাইল দিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম। দ্রুত হেঁটে এসে আগাথা ও ম্যানুয়েলের সঙ্গে যোগ দিই।

একত্রে আমরা সড়কের মোড় ফিরতেই দেখি, পুরোনো একটি রং উঠে যাওয়া দালানের পিলারের কাছে গাঁথা নানান রঙে রাঙানো একটি বিশাল মুখোশ। তার তলায় জড়ো হয়েছে গোটা সাতেক পথচারী। একজন নারী ফিকে সোনালি রঙের অত্যন্ত ফ্যাশনেবল ড্রেস পরে প্রকাণ্ড মুখোশটির তলায় মডেল-কন্যার মতো পোজ দিচ্ছে। মেয়েটির বাম বাহু সম্পূর্ণ নিরাবরণ। সে শ্রাগ করার ভঙ্গিতে বাম কাঁধ উঁচু করলে অনাবৃত হয় একটি স্তন। ঠিক তখনই তার সামনে এসে আড়াল করে দাঁড়ায় যমদূতের মতো দেখতে মুখোশ পরা এক কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ। আমরা অবাক হয়ে দেখি, মানুষটি পরে আছে দালানে গাঁথা মুখোশের অবিকল রেপ্লিকা। মেয়েটি এবার ঘুরে স্কার্টটি ঊর্ধ্বে তুলে মুখোশটিকে অভিবাদন জানাতে নত হতেই তার পশ্চাৎদেশ অনাবৃত হয়। সবাই উল্লসিত হয়ে হাততালি দেয়। একজন উৎসাহী পথচারী দৃশ্যটির ছবি তুলতে খানিকটা এগিয়ে গেলে, মুখোশ পরা যমদূতটি তার দিকে তাক করে টয়-রিভলবার। অতঃপর সে মুখোশ খুলে তা সকলের সামনে ধরলে, তাদের স্ট্রিট পারফরম্যান্সে খুশি হয়ে আমরা মুখোশে এক-দুটি ইউরো কয়েন ফেলি।

স্ট্রিট পারফরম্যান্স দেখতে দাঁড়িয়ে পড়ায় ম্যানুয়েল আবার অধৈর্য হয়। সে মুখে আঙুল দিয়ে শিস বাজিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে ইশারা দেয়। আগাথা মৃদু হেসে তাকে বলে, ‘ম্যান, হোয়াই আর ইউ গেটিং অল ইমপেশেন্ট? গোট এন্ড ক্যাবেজ রেস্টুরেন্ট ইজ রাইট হিয়ার।’ কথা বলতে বলতে আমরা এসে পড়ি স্ট্রিটের মোড়ের গোলাকার চত্বরে। ওখানে সড়কের লাগোয়া ‘ছাগল ও বাঁধাকপির ঠেক’ নামের রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ড। তার দোরগোড়ায় চেন দিয়ে বাঁধা সত্যিকারের একটি ধবধবে সাদা ছাগল। সে নিরাসক্তভাবে তাকিয়ে আছে তাকে খেতে দেওয়া তাজা বাঁধাকপির পাতার দিকে। আগাথা তার লোম ছুঁয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করলে, প্রাণীটি ‘ম্যাঁ’ করে জানান দেয় তার আপত্তি। ম্যানুয়েল বাঁধাকপির একটি পাতা তুলে তার মুখে দিতে গেলে ছাগলটি ঘাড় বাঁকিয়ে কটমট করে তার দিকে তাকায়। আগাথা তার হাত ধরে বলে, ‘দিস ইজ আ ভেরি সিরিয়াস, নো-ননসেন্স টাইপ গোট। ডোন্ট বাগ হার, তোমাকে গুঁতিয়ে দিতে সে পিছপা হবে না।’

ম্যানুয়েল তার কথায় হো হো করে হেসে বলে, ‘আগাথা, কাম এন্ড ডু অ্যা গোট ড্যান্স উইথ মি?’ সে চটুল ভঙ্গিতে জবাব দেয়, ‘নো ডিয়ার, ইউ ডু দ্য ড্যান্স; আমি তোমার নৃত্যে সঙ্গত করছি একটি চমৎকার ছাগল-বিষয়ক গান।’ খোলা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ম্যানুয়েল সত্যি সত্যিই নেচে ওঠে। তার নাচের ভঙ্গি কেমন যেন রোবটের মতো। আগাথা আমাকে অবাক করে দিয়ে গায়, ‘আই অ্যাম আ সিম্পল গোট, আই লিভ অন দ্য ব্যাক অব আ পিকআপ ট্রাক। দ্য ওল্ডম্যান টাইড মি হিয়ার উইথ আ থ্রি ফুট রোপ...।’ গাইতে গাইতে হাত ধরাধরি করে তারা ঢুকে পড়ে রেস্তোরাঁয়। প্রবেশপথে এক আলজেরীয় অভিবাসী আমাদের ফরাসি কেতায় সম্ভাষণ জানান। চেয়ার টেনে বসতে গিয়ে দেয়ালে আফ্রিকার মাগরেব অঞ্চলের সাজসজ্জার দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমরা এসে পড়েছি ভারি আপস্কেল একটি রেস্তোরাঁয়।
খুব কম ভলিউমের মিউজিকে আচ্ছন্ন পরিবেশে আমরা মার্টিনি সিপ করতে করতে মেনুতে ‘উনে এনত্রে’ বা স্টার্টার বেছে নিতে যাই। আলজেরীয় অভিবাসীটি নিয়ে আসেন ব্রোঞ্জের একটি ট্রে। তাতে হরেক রকমের কাবাবের নমুনা। ম্যানুয়েল তুলে নেয় শিকে গাঁথা খাসির ঝলসানো এক টুকরা মাংস। আগাথা মিক্সড স্যালাড অর্ডার করে ম্যানুয়েলের হাত মুঠোয় নিয়ে একটু ঝুঁকে আমাকে বলে, ‘থ্যাংক ইউ সো মাচ ফর কামিং হিয়ার এন্ড গিভিং মি সাম টাইম।’
জবাবে আমি বলি, ‘মিউজিক হিয়ার ইজ ওয়ান্ডারফুল, আগাথা। গ্রিক ভাষায় তোমরা কীভাবে থ্যাংক ইউ বলো?’ আমার প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে সে বলে, ‘অল দিজ মিউজিকস্ ইন দিস রেস্টুরেন্ট আর ফ্রম সাহারা ডেজার্ট। আই লাভ দিস উইন্ডি মেলানকলিক সাউন্ড।’
আমি এবার জানতে চাই, ‘সো, ইউ হ্যাভ অ্যা ব্যাকগ্রাউন্ড ইন মিউজিক, আগাথা, অ্যাম আই রাইট?’ সে ম্লান হেসে শরীর একটু এডজাস্ট করে ম্যানুয়েলের হাত তার পায়ে রাখার সুযোগ করে দিয়ে বলে, ‘তুমি যে রকম ভাবছো, ও রকম কিছু না। গ্রিসের একটি গ্রামে আমি বড় হই। ওখানে কালেভদ্রে স্বজনহীন কারো মৃত্যু হলে, আমি চার্চের বারোয়ারি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পিয়ানো বাজিয়ে একটু-আধটু গাইতাম। দ্যাটস্ অল অ্যাবাউট মাই মিউজিক ব্যাকগ্রাউন্ড। নাথিং গ্লোরিয়াস অর ফ্যান্সি।’
স্টার্টার হিসাবে ম্যানুয়েল অনিয়ন স্যুপ চামচে তুলতে তুলতে খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে আছে। আমি চিজের প্রলেপ মাখানো তিল দেওয়া এক টুকরা রুটি খেতে খেতে তাদের দিকে তাকাই। আগাথা খুব আদুরে ভঙ্গিতে ফিসফিসিয়ে ফরাসি ভাষায় ম্যানুয়েলকে কিছু বলছে, আর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য গ্রীবা বাঁকিয়ে তার দিকে তাকাচ্ছে। সি-থ্রু টপে ভাসমান মেঘে বারবার আড়ালে চলে যাওয়া চাঁদের মতো লুকোচুরি করছে তার স্তনযুগল। ম্যানুয়েল চঞ্চল হয়ে তার ব্যাগ থেকে বের করে একটি পলিথিনের প্যাকেট। তা থেকে এক চিমটা শুকনা গোলাপের পাপড়ি তুলে নিয়ে সে তা ছিটিয়ে দেয়।
আগাথা ওয়াইন গ্লাস তুলে হাত বাড়িয়ে তা আমার গ্লাসে ঠেকায়। আমি তার সুগোল বাহুমূলের দিকে তাকাই। মনে হয়, গ্রিসের এই নারী আলিঙ্গনেও আশ্চর্য রকমের আন্তরিক হবেন। ম্যানুয়েল প্রচুর ওয়াইন সিপ করে আমার দিকে চোখের ইশারায় একটি বার্তা পাঠায়। আগাথার লো-কাট নেকলাইনে এসে পড়ে একটি শুকনো গোলাপের পাপড়ি। এতে উদ্বেল হয়ে গ্রিক নারীটি তার প্রার্থিত পুরুষের বাঁ হাত টেনে নেয়, তারপর নিজের চিবুক ঘষে তার করতলে। পাপড়িটি মৃত প্রজাপতির ভাঙা ডানার মতো লেগে থাকে তার বিভাজিকায়।
লা প্লাত প্রিন্সিপাল বা মূল পদ হিসেবে ম্যানুয়েলের জন্য আসে স্টেক টারটার নামে এক ধরনের খাবার। রো বিফের বড় বড় টুকরা কড়া ধাঁচের অ্যালকোহলযুক্ত সসে মেরিনেট করা হয়েছে। সাইড ডিশ হিসেবে সে সেদ্ধ আলুতে হানি-মাস্টার্ড মাখিয়ে খায়। আমার জন্য পরিবেশিত হয়েছে হ্যালিবাট মাছের এক টুকরা ফিলে। জিরা বাখার মিশিয়ে রান্না করা এ খাবারে ছড়ানো আছে ধনেপাতা ও চাকতি চাকতি লেবু। আগাথা তার গ্রিল করা গলদা চিংড়ির সঙ্গে দেওয়া ভাজা নারকেলের টুকরোগুলো কাঁটাচামচ দিয়ে সরিয়ে, লিকার কার্ট ঠেলে যাওয়া ওয়েটারকে ওয়াইন পরিবেশনের ইশারা করে। পরিবেশিত পদের সঙ্গে মিলিয়ে সে প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের ওয়াইন বেছে নেয়।
আমি হেলিবাট মাছের স্বাদ উপভোগ করতে করতে ম্যানুয়েলের দিকে তাকাই। কী যেন ভাবতে ভাবতে তার চোখের মণি ঘষা কাচের মতো ঘোলাটে হয়ে উঠছে। বুঝতে পারি, সে মনে মনে আগাথাকে কীভাবে সঙ্গ দেবে, তার পরিকল্পনা করছে। প্রচুর ওয়াইন সিপ করে ম্যানুয়েল চোখের ইশারায় আমাকে একটি বার্তা পাঠায়। আমি নীরবে বার্তাটির অর্থ বুঝে নিই। অনুমান করি, সে নিঃশব্দে বলতে চাইছে, আমরা সবাই এখানে জড়ো হয়েছি চমৎকার ফরাসি মুহূর্ত উপভোগ করতে—সো, এনজয় ইট।
আমাদের মেন কোর্স শেষ হয়েছে একটু আগে। চিজ কোর্স স্কিপ করে আমি ও আগাথা ডেজার্ট হিসেবে ক্রিম ক্যারামেল নেই। ম্যানুয়েল মিষ্টান্নের মেনুটি খুঁটিয়ে দেখে, তবে সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তখনই তার আইফোনে জরুরি মেসেজ আসে। সে ‘এক্সকিউজ-মোয়া’ (অর্থাৎ, ‘এক্সকিউজ মি’) বলে রেস্তোরাঁর প্রবেশপথের দিকে চলে যায়। আগাথা তার জন্য মস্ত বড় একটি পাফ পেস্ট্রির অর্ডার করে। তাতে স্তরে স্তরে ছড়ানো হুইপ ক্রিম, চকোলেট সস ও চাকতি চাকতি করে কাটা কিউই ফল। ডেজার্ট শেষ করে এসপ্রেসোতে চুমুক দিয়ে আগাথা ম্যানুয়েলকে ইঙ্গিত করে বলে, ‘অ্যাজ অ্যা ফ্রেন্ড ম্যানুয়েল ইজ ওয়ান্ডারফুল। কিন্তু সামান্য ঘণ্টা খানেকের জন্যও সে তোমাকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেবে না। তোমার পাশাপাশি বসে তোমাকে উষ্ণ সঙ্গ দিতে দিতে সে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করবে অন্য নারীর সঙ্গে।’ সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিতে আরেকবার চুমুক দেয়, আর আমি খেয়াল করি, তার চোখের দৃষ্টি অস্থির হয়ে ঘুরছে বোধ করি অন্য কোনো দৃশ্যপটে। দেখতে দেখতে তার বনানী-সবুজ চোখের তারায় জমে গাঢ় মেঘ।
আমি হাত বাড়িয়ে তার কব্জিতে চাপ দিয়ে জানতে চাই, ‘ম্যানুয়েল তোমাকে ইগনোর করে উঠে চলে যাওয়াতে কী তৈরি হচ্ছে স্ট্রেস?’ ম্লান হেসে আগাথা জবাব দেয়, ‘ম্যানুয়েল, ইউ নো, দিস ইজ মাই সেকেন্ড ম্যারেজ। আমার প্রথম স্বামীটি ছিল খুবই সুদর্শন ও অ্যাথলেটিক গোছের পুরুষ; সে জিমনেশিয়ামের ইন্সট্রাক্টর। আমাকে কমবেশি ভালোও বাসত। কিন্তু খুবই ডমিনিয়ারিং চরিত্রের মানুষ সে। বছরে মাত্র তিন-চার দিন আমি অন্য পুরুষের সঙ্গ পছন্দ করি। এই সামান্য বিষয়টাও সে সহ্য করতে পারত না; খামোকা ঝামেলা করত। তাই তাকে ডিভোর্স দিয়ে এই বয়স্ক লোকটিকে বিয়ে করেছি। ম্যানুয়েল কথা দিয়েছে, আমার স্ট্রেস লাঘবে সে সাহায্য করবে। আই ট্রাস্ট হিম, কিন্তু, তোমাকে ফ্র্যাঙ্কলি বলছি, আমার স্ট্রেসের উৎস আমার নিজের সঙ্গেই।’
আমার বিষয়টা বিস্তারিত জানতে পারলে তুমি এতে উপন্যাস লেখার উপাদান খুঁজে পাবে। আমার দ্বিতীয় স্বামী বয়সে অনেক বড় হলেও বিত্তবান। একটি পুরোনো, বজরার মতো ইয়াটে ভেসে বেড়ানো এবং তার চেয়েও পুরোনো, জংধরা ছোট্ট বিমানে উড়তে সে পছন্দ করে। এগুলো বদলে নতুন মডেলের প্রাইভেট প্লেন বা ঝকঝকে ছোট্ট ইয়াট কেনা তার জন্য তেমন কিছুই নয়। কিন্তু সে পুরোনো জিনিসগুলো একেবারেই বদলাতে চায় না। এমনকি নতুন জামাকাপড়, স্যুট বা জুতা পর্যন্ত কিনতে চায় না। তো, তার বজরার মতো ইয়াটটি বিকল হয়ে মন্টিকার্লোর বালুচরে পড়ে আছে। সেটি সারাতে তিন-চার দিন লাগবে।
তার কাহিনীতে তীব্রভাবে আগ্রহী হয়ে আমি বলি, ‘আগাথা, আই আন্ডারস্ট্যান্ড, ব্রোকেন-ডাউন ইয়াটের বিষয়টি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে।’ ‘নট রিয়েলি,’ বলে দ্রুত জবাব দিয়ে সে জানায়, ‘ইয়াটটি নষ্ট হওয়া আমার বড় দুশ্চিন্তা নয়। কিন্তু আমার প্রথম স্বামী আমার পরিবারের জন্য বড় বিপদ তৈরি করেছে।’
আমি এবার জানতে চাই, ‘আগাথা, তবে কি তোমার বয়স্ক দ্বিতীয় স্বামীটি এবার গোল পাকাচ্ছে?’ সে লাজুক হেসে জবাব দেয়, ‘হি ইজ অ্যা ফাইন জেন্টলম্যান, ঝামেলা করা তার স্বভাব না। বাট মাই ফার্স্ট হাজবেন্ড হ্যাজ ক্রিয়েটেড অ্যা বিগ ট্রাবল ফর মাই ফ্যামিলি।’
‘সে কি তোমাকে ফিরে পেতে চাইছে, আগাথা?’ জানতে চাইলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে জবাব দেয়, ‘ওয়ার্স্ট দেন দ্যাট। আমার দ্বিতীয় স্বামীর আগের পক্ষের একটি কন্যা আছে। তার নাম কেইলি, মেয়েটির বয়স মাত্র একুশ। সে এথেন্সের একটি ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। আমার প্রথম স্বামী ওই ইউনিভার্সিটির জিমনেশিয়ামের ইন্সট্রাক্টর। তো ঘটনা হচ্ছে, সংক্ষেপে বলছি: আমার স্টেপ-ডটার কেইলি তিন দিন আগে কোর্টে গিয়ে আমার প্রথম স্বামীকে বিয়ে করেছে!’
কাহিনি শুনে আমি প্রতিক্রিয়ায় কী বলব, কোনো প্রসঙ্গ খুঁজে পাই না। আগাথা আবার কথা বলে, ‘মাই সেকেন্ড হাজবেন্ড ইজ ফিলিং ভেরি অ্যাংরি এন্ড বিট্রেইড। আমি যে আমার প্রথম হাজবেন্ডের সঙ্গে কালেভদ্রে যৎসামান্য যোগাযোগ রাখছি, সে নিয়ে সে কখনো কোনো আপত্তি তোলেনি। যোগাযোগ না রেখে আমার অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। আমার প্রথম পক্ষের এক উনিশ বছর বয়সী পুত্রসন্তান আছে। আমার স্টেপ-ডটার কেইলিকে আমিই আমার প্রথম হাজবেন্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই।’
ম্যানুয়েল ফিরে আসে তাজা একটি গোলাপ নিয়ে। বোধ করি রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে ‘লা আমোর ডে ফ্লোর’ থেকে তা কিনে এনেছে। সে আগাথার হাত ধরে টেনে তুলে তাকে চুমো খেয়ে বলে, ‘হানিসাকোল, লেটস্ গো। আই অ্যাম ফিলিং বোরড হিয়ার।’ আগাথা দ্রুত ক্রেডিট কার্ড দিয়ে বিল পরিশোধ করে। রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে ঠিক হয়, ওরা ট্যাক্সি-ক্যাব নেবে। আমি ভূগর্ভস্থ ট্রেন ধরে মেট্রোর দিকে রওনা হতে গেলে আগাথা হাত ধরে আন্তরিকভাবে আমাকে চুমো খায়। ম্যানুয়েল কোনো কথা বলে না, সে একটি সিগারিলো ধরিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে সড়কে পর্যটকদের চলাচল দেখতে থাকে।
মন্তব্য করুন
মন্তব্যটি পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হবে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি
এখনও কোনো প্রকাশিত মন্তব্য নেই।