প্যারিসের ছাগল ও বাঁধাকপির ঠেক
আজ সকালের পুরোটাই আমার কেটেছে ম্যানুয়েল নামের আমেরিকার এক হিস্পানিক তরুণের সাথে। আমার মতো ম্যানুয়েলও প্যারিসের রকমারি আর্ট অবজেক্টে সজ্জিত একটি হোটেলে বাস করছে। মাস ছয়েক আগে ম্যানুয়েল মিসাইল ছোড়া গানার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নেভির একটি নিউক্লিয়ার সমরাস্ত্রবাহী সাবমেরিনে কর্মরত ছিল। কোনো কারণে চাকরিচ্যুত হয়ে সে প্যারিসে ঘুরে বেড়িয়ে সময় কাটাচ্ছে।
আজ সকালবেলা আমি তার সাথে নগরীর শ্যাঁজেলিজে বলে একটি সরণীতে বাস্তিল ডে পালনের উৎসব দেখতে গিয়েছিলাম। ওখানে ম্যানুয়েল আমাকে আগাথা নামে এক গ্রিক নারীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। বুঝতে পারি, আগাথার সাথে তার বন্ধুত্ব জমে উঠছে। বাস্তিল ডে’র অনুষ্ঠান শেষ হতেই আগাথা তার চেনা একটি রেস্তোরাঁয় লাঞ্চে যেতে চায়। সে ম্যানুয়েলের সাথে আমাকেও মধ্যাহ্নভোজে শরিক হতে আন্তরিকভাবে অনুরোধ করে।
শ্যাঁজেলিজে থেকে বেরিয়ে হেঁটে দুটি ব্লক অতিক্রম করে আমরা পা দিই পথচারীদের চলাচলে ভাইব্রেন্ট একটি স্ট্রিটে। প্রশস্ত এ রাজপথে গাড়িঘোড়া কিছু নেই। পায়ে হেঁটে চলছে পর্যটকরা। কেউ কেউ ঘরঘরিয়ে রোলার স্কেট বা স্কেটবোর্ড হাঁকাচ্ছে। হেলমেট মাথায় শর্টস পরা একটি মেয়ে বাইসাইকেলে প্যাডেল করতে করতে অবাক হয়ে আমাদের অবলোকন করে।
আমরা ঢুকে পড়ি একটি বাই-লেনের দিকে। এদিকে দোকানপাট প্রচুর। আমাদের পাশ কাটিয়ে হেঁটে যায় শপিংব্যাগ হাতে হাসিখুশি, চৌকস চেহারার দুই তরুণী। যেতে যেতে ‘লা আমোর ডে ফ্লোর’ নামে একটি ফুলের দোকানে চোখ পড়ে। ইচ্ছা হয়, ওখানে ঢুকে পড়ে আগাথার জন্য কিনি এক গুচ্ছ শিশিরস্নাত চন্দ্রমল্লিকা। কিন্তু ব্যাপারটি হয়তো ম্যানুয়েলের পছন্দ হবে না, তাই চেপে গিয়ে নীরবে পা বাড়াই।
মনে হয়, আগাথা এ এলাকার পথঘাট ভালো চেনে। সে আমাদের নিয়ে ঢুকে পড়ে সম্পূর্ণ নির্জন একটি সড়কে। পথের দু’পাশে বিশাল সব আবাসিক ইমারতে লাগানো কাঠের শাটার দেওয়া মস্ত মস্ত ফ্রেঞ্চ উইন্ডো। প্রতিটি জানালার নকশা ও রঙ সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিটি বাড়ির সামনে টবে টবে প্রচুর ফুল। মনে হয়, জানালার বর্ণের সাথে ম্যাচ করে রঙ করা হয়েছে টবগুলো।
সড়কের ঠিক মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে অলস ভঙ্গিতে লেজ নাড়ছে দুটি ছানা-পোনা সহ একটি লোমশ বিড়ালি। কিছু কিছু বাড়ির দেয়ালে নানা রকমের ছবি আঁকা। একটি ছবিতে তিন-তিনটি উটপাখি দেখে আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। একটি উটপাখিতে সওয়ার হওয়া একজন মানুষ চিত্রটিকে রূপান্তরিত করেছে রূপকথার ফ্যান্টাসিতে।
সিয়েরা লিওনে আমার আপাত নিঃসঙ্গ জীবনে আমি মাঝে মাঝে লেবানিজ এক নারীর সাথে ক্যাফে কিংবা পানশালায় বসতে ভালোবাসি। নানা দেশের বিচিত্র সব স্ট্রিট-আর্ট সংগ্রহ করতে সে পছন্দ করে। আমি তার কথা ভাবতে ভাবতে আমার মোবাইল ডিভাইসে তুলে নিই উটপাখিতে চড়া মানুষটির ফটোগ্রাফ।
ছবি তুলতে গিয়ে আমি একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম। দ্রুত হেঁটে এসে যোগ দিই আগাথা ও ম্যানুয়েলের সাথে। একত্রে আমরা সড়কের মোড় ফিরতেই দেখি, পুরোনো একটি রঙ উঠে যাওয়া দালানের পিলারের কাছে গাঁথা বিবিধ বর্ণে বর্ণিল একটি বিশাল মুখোশ। তার তলায় জড়ো হয়েছে গোটা সাতেক পথচারী।
একজন নারী ফিকে সোনালি রঙের অত্যন্ত ফ্যাশনেবল ড্রেস পরে প্রকাণ্ড মুখোশটির তলায় মডেলকন্যার মতো পোজ দিচ্ছে। মেয়েটির বাম বাহু সম্পূর্ণ নিরাবরণ। সে শ্রাগ করার ভঙ্গিতে বাম কাঁধ উঁচু করলে অনাবৃত হয় একটি স্তন।
ঠিক তখনই তার সামনে এসে আড়াল করে দাঁড়ায় যমদূতের মতো দেখতে মুখোশ পরা এক কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ। আমরা অবাক হয়ে দেখি, মানুষটি পরে আছে দালানে গাঁথা মুখোশের অবিকল রেপ্লিকা।
মেয়েটি এবার ঘুরে স্কার্ট ঊর্ধ্বে তুলে দেয়ালের বর্ণাঢ্য মুখোশটিকে আড়াল করলে প্রকাশিত হয় তার গুরু-নিতম্বের বেশ খানিকটা। সিল্কের সুচারু অন্তর্বাসে আঁকা হার্ট শেপ দেখতে পেয়ে পুরুষ পথচারীরা উল্লসিত হয়ে হাততালি দেয়।
একজন পথচারী এক্সাইটেড হয়ে দৃশ্যটির ছবি তুলতে ক্যামেরা হাতে নিতেই মুখোশ পরা যমদূতটি তার দিকে তাক করে টয়-রিভলবার। অতঃপর সে মুখোশ খুলে তা সকলের সামনে ধরলে তাদের স্ট্রিট পারফরম্যান্সটি বুঝি যায়। তাতে আমরা খুশি হয়ে একটি বা দুটি ইউরোর কয়েন ফেলি।
স্ট্রিট পারফরম্যান্স দেখতে দাঁড়িয়ে পড়াতে ম্যানুয়েল আবার অধৈর্য হয়। সে মুখে আঙুল দিয়ে শিস বাজিয়ে আমাদের আগ বাড়তে ইশারা দেয়। আগাথা মৃদু হেসে তাকে বলে,
“ম্যান, হোয়াই আর ইউ গেটিং অল ইমপেশেন্ট? গোট অ্যান্ড ক্যাবেজ রেস্টুরেন্ট ইজ রাইট হিয়ার।”
কথা বলতে বলতে আমরা এসে পড়ি স্ট্রিটের মোড়ের গোলাকার চত্বরে। ওখানে সড়কের লাগোয়া ‘ছাগল ও বাঁধাকপির ঠেক’ নামের রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ড।

তার দোরগোড়ায় চেন দিয়ে বাঁধা সত্যিকারের একটি ধবধবে সাদা ছাগল। সে নিরাসক্তভাবে তাকিয়ে আছে তাকে খেতে দেওয়া তাজা বাঁধাকপির পাতার দিকে। আগাথা তার লোম ছুঁয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করলে প্রাণীটি “চ্যা ব্যা” করে জানান দেয় তার আপত্তি।
ম্যানুয়েল বাঁধাকপির একটি পাতা তুলে তার মুখে দিতে গেলে ছাগলটি ঘাড় বাঁকিয়ে কটমট করে তার দিকে তাকায়। আগাথা তার হাত ধরে বলে,
“দিস ইজ আ ভেরি সিরিয়াস, নো-ননসেন্স টাইপ গোট। ডোন্ট বাগ হার, তোমাকে গুঁতিয়ে দিতে সে পিছপা হবে না।”
ম্যানুয়েল তার কথায় হো হো করে হেসে বলে,
“আগাথা, কাম অ্যান্ড ডু আ গোট ড্যান্স উইথ মি?”
সে চটুল ভঙ্গিতে জবাব দেয়,
“নো ডিয়ার, ইউ ডু দ্য ড্যান্স, আমি তোমার নৃত্যে সঙ্গত করছি একটি চমৎকার ছাগলবিষয়ক গান।”
খোলা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ম্যানুয়েল সত্যি সত্যিই নেচে ওঠে। তার নাচের ভঙ্গি কেমন যেন রোবটের মতো। আগাথা আমাকে অবাক করে দিয়ে গায়,
“আই অ্যাম আ সিম্পল গোট,
আই লিভ অন দ্য ব্যাক অব আ পিকআপ ট্রাক।
দ্য ওল্ড ম্যান টাইড মি হিয়ার উইথ আ থ্রি-ফুট রোপ…”
গাইতে গাইতে হাত ধরাধরি করে তারা ঢুকে পড়ে রেস্তোরাঁয়। এন্ট্রান্সে এক আলজেরীয় অভিবাসী আমাদের ফরাসি কেতায় সম্ভাষণ জানান। চেয়ার টেনে বসতে গিয়ে দেয়ালে আফ্রিকান মাগরেবের ডেকোরগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমরা এসে পড়েছি ভারি আপস্কেল একটি রেস্তোরাঁয়।
অত্যন্ত লো-ভলিউমের মিউজিকে আচ্ছন্ন পরিবেশে আমরা মার্টিনি সিপ করতে করতে মেনুতে ‘উন এন্ত্রে’ বা স্টার্টার সিলেক্ট করতে যাই। আলজেরীয় অভিবাসীটি নিয়ে আসেন ব্রোঞ্জের খুঞ্চা। তাতে হরেক রকমের কাবাবের স্যাম্পল।
ম্যানুয়েল তুলে নেয় শিকে গাঁথা খাসির ঝলসানো এক টুকরা মাংস। আগাথা মিক্সড স্যালাডের অর্ডার করে ম্যানুয়েলের হাত তার মুঠোয় নিয়ে একটু ঝুঁকে আমাকে বলে,
“থ্যাংক ইউ সো মাচ ফর কামিং হিয়ার অ্যান্ড গিভিং মি সাম টাইম।”
জবাবে আমি বলি,
“মিউজিক হিয়ার ইজ ওয়ান্ডারফুল, আগাথা। গ্রিক ভাষায় তোমরা কীভাবে থ্যাংক ইউ বলো?”
আমার প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে সে বলে,
“অল দিজ মিউজিকস ইন দিস রেস্টুরেন্ট আর ফ্রম সাহারা ডেজার্ট। আই লাভ দিস উইন্ডি মেলানকোলিক সাউন্ড।”
আমি এবার জানতে চাই,
“সো, ইউ হ্যাভ আ ব্যাকগ্রাউন্ড ইন মিউজিক, আগাথা? অ্যাম আই রাইট?”
সে ম্লান হেসে শরীর একটু অ্যাডজাস্ট করে ম্যানুয়েলের হাত তার পায়ে রাখার সুযোগ করে দিয়ে বলে,
“তুমি যে রকম ভাবছ, ও রকম কিছু না। গ্রিসের একটি গ্রামে আমি বড় হই। ওখানে কালেভদ্রে স্বজনহীন কারও মৃত্যু হলে আমি চার্চের বারোয়ারি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পিয়ানো বাজিয়ে একটু-আধটু গাইতাম। দ্যাটস অল অ্যাবাউট মাই মিউজিক ব্যাকগ্রাউন্ড। নাথিং গ্লোরিয়াস অর ফ্যান্সি।”
স্টার্টার হিসেবে ম্যানুয়েল অনিয়ন স্যুপ চামচে তুলতে তুলতে খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে আছে। আমি চিজের প্রলেপ মাখানো, সেসমি সিড দেওয়া এক টুকরা রুটি খেতে খেতে তাদের দিকে তাকাই।
আগাথা খুব আদুরে ভঙ্গিতে ফিসফিসিয়ে ফরাসি ভাষায় ম্যানুয়েলকে কিছু বলছে, আর রিঅ্যাকশন দেখার জন্য গ্রীবা বাঁকিয়ে তার দিকে তাকাচ্ছে। সি-থ্রু টপে ভাসমান মেঘে বারবার আড়ালে চলে যাওয়া চাঁদের মতো লুকোচুরি করছে তার স্তনযুগল।
ম্যানুয়েল চঞ্চল হয়ে তার ব্যাগ থেকে বের করে একটি পলিথিনের প্যাকেট। তা থেকে এক চিমটি শুকনা গোলাপের পাপড়ি তুলে নিয়ে সে তা ছিটিয়ে দেয় আগাথার লোকাট নেকলাইনে। গ্রিক নারীটি তাতে উদ্বেল হয়ে তার প্রার্থিত পুরুষের বাঁ-হাত টেনে এনে করতলে ঘষে তার চিবুক। একটি শুকনা পাপড়ি মৃত প্রজাপতির ভাঙা ডানার মতো লেগে থাকে তার বিভাজিকায়।

লা প্লাত প্রিন্সিপাল বা মেইন কোর্স হিসেবে ম্যানুয়েলের জন্য আসে স্টেক তারতার বলে এক ধরনের খাবার। এতে রো বিফের গাবদা গাবদা টুকরা মেরিনেট করা হয়েছে কড়া ধাঁচের অ্যালকোহলিক সসে। সাইড ডিশ হিসেবে সে সিদ্ধ পটেটোতে হানি-মাস্টার্ড মাখিয়ে মুখে তোলে।
আমার জন্য পরিবেশিত হয়েছে হেলেবেথ মাছের এক টুকরা ফিলে। জিরা-বাখর মিশিয়ে রান্না করা এ খাবারে ছড়ানো আছে ধনেপাতা ও চাকতি চাকতি লেবু।
আগাথা তার গ্রিল করা গলদা চিংড়ি থেকে ফর্ক দিয়ে ফালি ফালি করে কেটে দেওয়া ভাজা নারকেলের টুকরা সরিয়ে লিকার কার্ট ঠেলে হেঁটে যাওয়া ওয়েটারকে ওয়াইন সার্ভ করতে ইশারা করে। বেশ মনোযোগ দিয়ে পরিবেশিত পদের সাথে ম্যাচ করে সে সিলেক্ট করে প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের ওয়াইন।
আমি হেলেবেথ মাছের স্বাদ উপভোগ করতে করতে ম্যানুয়েলের দিকে তাকাই। কী যেন ভাবতে ভাবতে তার চোখের মণি ঘষা কাঁচের মতো ঘোলাটে হয়ে উঠছে। বুঝতে পারি, সে মনে মনে আগাথাকে কীভাবে সঙ্গ দেবে তার পরিকল্পনা করে নিচ্ছে।
আগাথা ওয়াইনের গ্লাস তুলে হাত বাড়িয়ে তা আমার গ্লাসে ঠেকায়। আমি তার সুগোল বাহুমূলের দিকে তাকাই। মনে হয়, গ্রিস দেশের এ নারী আলিঙ্গনেও হবে আশ্চর্য রকমের আন্তরিক।
ম্যানুয়েল প্রচুর পরিমাণে ওয়াইন সিপ করে আমার দিকে চোখের ইশারায় একটি বার্তা পাঠায়। আমি নীরবে তার মেসেজ ইন্টারপ্রেট করি। অনুমানে বুঝতে পারি, সে নিঃশব্দে বলতে চাইছে, আমরা সবাই এখানে জড়ো হয়েছি চমৎকার ফরাসি মুহূর্ত উপভোগ করতে—সো, এনজয় ইট।
আমাদের মেইন কোর্স শেষ হয়েছে একটু আগে। চিজ কোর্স স্কিপ করে আমি ও আগাথা ডেজার্ট হিসেবে ক্রিম ক্যারামেল নিই। ম্যানুয়েল মিষ্টান্নের মেনুটি খুঁটিয়ে দেখে, তবে সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
তখনই তার আইফোনে জরুরি মেসেজ আসে। সে “এক্সকিউজ-মোয়া” বা “এক্সকিউজ মি” বলে উঠে চলে যায় রেস্তোরাঁর এন্ট্রান্সের দিকে।
আগাথা তার জন্য মস্ত বড় একটি পাফ-পেস্ট্রির অর্ডার করে। তাতে স্তরে স্তরে ছড়ানো হুইপড ক্রিম, চকলেট সস ও চাকতি চাকতি করে কাটা কিউই ফল।
ডেজার্ট শেষ করে এসপ্রেসোতে চুমুক দিয়ে আগাথা ম্যানুয়েলকে ইঙ্গিত করে মন্তব্য করে,
“অ্যাজ আ ফ্রেন্ড, ম্যানুয়েল ইজ ওয়ান্ডারফুল। কিন্তু সামান্য ঘণ্টাখানেকের জন্যও সে তোমাকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেবে না। তোমার পাশাপাশি বসে তোমাকে উষ্ণ সঙ্গ দিতে দিতে সে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করবে অন্য নারীর সাথে।”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিতে আরেকবার চুমুক দেয়, আর আমি খেয়াল করি, তার চোখের দৃষ্টি অস্থির হয়ে ঘুরছে, বোধ করি অন্য কোনো দৃশ্যপটে। দেখতে দেখতে তার বনানী-সবুজ চোখের তারায় জমে গাঢ় মেঘ।
আমি হাত বাড়িয়ে তার কব্জিতে চাপ দিয়ে জানতে চাই,
“ম্যানুয়েল তোমাকে ইগনোর করে উঠে চলে যাওয়াতে কী তৈরি হচ্ছে, স্ট্রেস?”
ম্লান হেসে আগাথা জবাব দেয়,
“ম্যানুয়েল, ইউ নো, দিস ইজ মাই সেকেন্ড ম্যারেজ। প্রথম বিয়েতে আমার হাজব্যান্ডটি ছিল খুবই সুদর্শন ও অ্যাথলেটিক গোছের পুরুষ, জিমনেশিয়ামের ইনস্ট্রাক্টর। আমাকে সে ভালোও বাসত, মোর অর লেস। কিন্তু খুবই ডমিনিয়ারিং চরিত্রের মানুষ সে। সারা বছরে মাত্র তিন বা চার দিন আমি পছন্দ করি ভিন্ন পুরুষের সঙ্গ…”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলে,

“কথা দিয়েছে, আমার স্ট্রেস লাঘবে সে সাহায্য করবে। আই ট্রাস্ট হিম, কিন্তু তোমাকে ফ্র্যাঙ্কলি বলছি, আমার স্ট্রেসের উৎস আমার নিজের সংসার।”
শুনে প্রতিক্রিয়ায় আমি বলি,
“আই অ্যাম বিকামিং সো কিউরিয়াস ইন ইয়োর লাইফ।”
এবার সে রহস্যময়ভাবে হেসে বলে,
“আমার বিষয়টা বিস্তারিত জানতে পারলে তুমি এতে খুঁজে পাবে উপন্যাস লেখার উপাদান। আমার সেকেন্ড হাজব্যান্ড বয়সে অনেক বড় হলেও তার বিত্ত অনেক। একটি পুরোনো বজরা গোছের ইয়টে ভেসে বেড়ানো এবং তার চেয়েও পুরোনো জংধরা ছোট্ট বিমানে উড়তে সে পছন্দ করে।
এগুলো বদলিয়ে নতুন মডেলের প্রাইভেট প্লেন বা ছোটখাটো ঝকঝকে একটি ইয়ট ক্রয় করা তার জন্য তেমন কিছু না। কিন্তু সে পুরোনো জিনিসগুলো বদলাতে চায় না একেবারে। এমনকি নতুন কোনো জামাকাপড়, স্যুট বা জুতা পর্যন্ত কিনতে চায় না।
তো, তার বজরা গোছের ইয়টটি বিকল হয়ে পড়ে আছে মন্টিকার্লোর বালুচরে। তা সারাই করাতে লাগবে তিন কিংবা চার দিন।”
তার কাহিনীতে তীব্রভাবে আগ্রহী হয়ে আমি বলি,
“আগাথা, আই আন্ডারস্ট্যান্ড, ব্রোকেন-ডাউন ইয়টের বিষয়টি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে।”
“নট রিয়েলি,” বলে দ্রুত জবাব দিয়ে সে জানায়, “ইউ নো, দিস ইজ মাই সেকেন্ড ম্যারেজ। প্রথম বিয়েতে আমার হাজব্যান্ডটি ছিল খুবই সুদর্শন ও অ্যাথলেটিক গোছের পুরুষ, জিমনেশিয়ামের ইনস্ট্রাক্টর। আমাকে সে ভালোও বাসত, মোর অর লেস। কিন্তু খুবই ডমিনিয়ারিং চরিত্রের মানুষ সে।
সারা বছরে মাত্র তিন বা চার দিন আমি পছন্দ করি ভিন্ন পুরুষের সঙ্গ। সামান্য এ বিষয়টা সে সহ্য করতে পারত না। খামোকা ঝামেলা করত। তাই আমি তাকে ডিভোর্স করে এ বয়স্ক লোককে বিয়ে করেছি।”
আমি এবার জানতে চাই,
“আগাথা, তবে কি তোমার বয়স্ক দ্বিতীয় স্বামীটি এবার গোল পাকাচ্ছে?”
সে লাজুক হেসে জবাব দেয়,
“হি ইজ আ ফাইন জেন্টলম্যান, ঝামেলা করা তার স্বভাব না। বাট মাই ফার্স্ট হাজব্যান্ড হ্যাজ ক্রিয়েটেড আ বিগ ট্রাবল ফর মাই ফ্যামিলি।”
“সে কি তোমাকে ফিরে পেতে চাচ্ছে, আগাথা?” জানতে চাইলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে জবাব দেয়,
“ওয়ার্স দ্যান দ্যাট। আমার সেকেন্ড হাজব্যান্ডের আগের তরফে আছে একটি কন্যাসন্তান। তার নাম কেইলি। মেয়েটির বয়স মাত্র একুশ। সে এথেন্সের একটি ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। আমার ফার্স্ট হাজব্যান্ড ওই ইউনিভার্সিটির জিমনেশিয়ামের ইনস্ট্রাক্টর।
তো ঘটনা হচ্ছে, সংক্ষেপে তোমাকে বলছি, আমার স্টেপ-ডটার কেইলি তিন দিন আগে কোর্টে গিয়ে বিয়ে করেছে আমার ফার্স্ট হাজব্যান্ডকে!”
কাহিনি শুনে আমি প্রতিক্রিয়ায় কী বলব, কোন প্রসঙ্গ খুঁজে পাই না। আগাথা আবার কথা বলে,
“মাই সেকেন্ড হাজব্যান্ড ইজ ফিলিং ভেরি অ্যাংরি অ্যান্ড বিট্রেইড। আমি যে আমার প্রথম হাজব্যান্ডের সাথে কালেভদ্রে যৎসামান্য যোগাযোগ রাখছি, সে নিয়ে সে কখনো কোনো আপত্তি তোলেনি। যোগাযোগ না রেখে আমার অন্য কোনো উপায়ও ছিল না।
আমার প্রথম তরফে আছে আমাদের একটি উনিশ বছরের পুত্রসন্তান। আমার স্টেপ-ডটার কেইলিকে আমিই আমার প্রথম হাজব্যান্ডের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।”
দেয়ালে আঁকা উটপাখির চিত্র

ম্যানুয়েল ফিরে আসে তাজা একটি গোলাপ নিয়ে। বোধ করি রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে ‘লা আমোর ডে ফ্লোর’ থেকে তা কিনে এনেছে। সে আগাথার হাত ধরে টেনে তুলে তাকে চুমু খেয়ে বলে,
“হানিসাকল, লেটস গো। আই অ্যাম ফিলিং বোরড হিয়ার।”
আগাথা দ্রুত ক্রেডিট কার্ডে বিল পরিশোধ করে। রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে ঠিক হয়, ওরা ট্যাক্সি-ক্যাব নেবে। আমি মেট্রোর দিকে রওয়ানা হতে গেলে আগাথা হাত ধরে আন্তরিকভাবে আমাকে চুমু খায়।
ম্যানুয়েল কোনো কথা বলে না। সে একটি সিগারিলো ধরিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দেখতে থাকে সড়কে পর্যটকদের পথচলা।
নতুন লেখা সবার আগে পড়ুন
নতুন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ও অন্যান্য সৃজনশীল লেখা প্রকাশের খবর পেতে আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন।